মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ইরানের ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি। দশকের পর দশক ধরে চলা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আর অর্থনৈতিক চাপকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তেহরান আজ এমন এক সামরিক উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা ভাবিয়ে তুলছে ওয়াশিংটন থেকে তেল আবিব পর্যন্ত। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই ‘মিসাইল আর্সেনাল’ এখন শুধু আত্মরক্ষার ঢাল নয়, বরং প্রতিপক্ষের জন্য এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।
কেন এতোটা শক্তিশালী ইরান?
যুগান্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন ৫টি কারণ, যা ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের অবিসংবাদিত মিসাইল শক্তিতে পরিণত করেছে:
১. লক্ষ্যভেদে নির্ভুলতা (Precision Strike): এক সময় ইরানের মিসাইল নিয়ে উপহাস করা হলেও, এখন আর সেই দিন নেই। বর্তমানের ‘খায়বার শেকান’ বা ‘রেজওয়ান’ মিসাইলগুলো শত শত কিলোমিটার দূর থেকেও একদম নির্দিষ্ট বিন্দুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এই নিখুঁত নিশানা শত্রুপক্ষের সামরিক ঘাঁটিকে মুহূর্তেই গুঁড়িয়ে দিতে পারে।
২. হাইপারসনিক যুগের সূচনা: ইরানের দাবি করা ‘ফাত্তাহ’ হাইপারসনিক মিসাইল এখন বড় চিন্তার কারণ। শব্দের চেয়ে ১৫ গুণ দ্রুতগতির এই ক্ষেপণাস্ত্র কোনো রাডার বা আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। এটি আকাশের যেকোনো ডিফেন্স শিল্ডকে ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।
৩. মাটির নিচে ‘মিসাইল সিটি’: ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের বড় একটা অংশ লুকিয়ে রেখেছে মাটির শত শত ফুট গভীরে। পাহাড়ের গুহায় এবং ভূগর্ভস্থ এসব টানেলকে বলা হয় ‘মিসাইল সিটি’। ফলে কোনো শত্রু দেশ চাইলেই এক হামলায় ইরানের সব মিসাইল ধ্বংস করতে পারবে না।
৪. কম খরচে ড্রোন ও মিসাইলের মিশেল: ইরান এখন ড্রোন ও মিসাইলের এক ভয়াবহ সমন্বয় ঘটিয়েছে। প্রথমে শত শত সস্তা ড্রোন পাঠিয়ে শত্রুর এয়ার ডিফেন্সকে ব্যস্ত রাখা হয়, আর সেই ফাঁকে মূল ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আঘাত হানে। রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধে ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোনের কার্যকারিতা দেখে পশ্চিমা বিশ্ব এখন আরও বেশি শঙ্কিত।
৫. প্রক্সি নেটওয়ার্কের হাতে প্রযুক্তির বিস্তার: ইরান শুধু নিজের ভূখণ্ডেই সীমাবদ্ধ নয়। তাদের তৈরি ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তি এখন লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথিদের হাতে। এর ফলে ইরানকে আক্রমণ করলে তার পাল্টা জবাব শুধু তেহরান থেকে নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো প্রান্ত থেকে আসতে পারে।
সমর বিশারদদের শঙ্কা
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের এই সক্ষমতা মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ বা আমেরিকার ‘প্যাট্রিয়ট’ সিস্টেম যে ইরানের সব মিসাইল ঠেকাতে পারবে না, তা গত কয়েক মাসের উত্তপ্ত পরিস্থিতিই প্রমাণ করে দিয়েছে।
যুগান্তরের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ইরানের এই ‘ডিটারেন্স’ বা পাল্টা আঘাত হানার ক্ষমতা সরাসরি যুদ্ধ শুরু করার আগে যেকোনো দেশকেই দশবার ভাবতে বাধ্য করছে।



















