রণাঙ্গনে প্রবাদ আছে— ‘শত্রুর অস্ত্র দিয়েই শত্রুকে ঘায়েল করা যুদ্ধের সেরা কৌশল।’ মধ্যপ্রাচ্যের পাওয়ার হাউস ইরান যেন এই প্রবাদকেই বাস্তবে রূপ দিচ্ছে। কয়েক দশক ধরে আমেরিকার কঠোর নিষেধাজ্ঞা আর রক্তচক্ষুকে তোয়াক্কা না করে, খোদ মার্কিন প্রযুক্তিকেই হাতিয়ার বানিয়ে ওয়াশিংটনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে তেহরান। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান এখন ‘রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা প্রযুক্তির উল্টো রথে চড়ে আমেরিকার তৈরি সমরাস্ত্র দিয়েই মার্কিন বাহিনীকে কুপোকাত করার ছক কষছে।
শাহ আমলের উত্তরাধিকার: আমেরিকার কাঁটায় আমেরিকারই গলা কাটছে?
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরান ছিল আমেরিকার অন্যতম প্রধান মিত্র। সেই সময় ওয়াশিংটন দুহাত ভরে তেহরানকে দিয়েছিল আধুনিক সব যুদ্ধবিমান ও মিসাইল সিস্টেম। বিপ্লবের পর সেই মিত্রতা শত্রুতায় রূপ নিলেও আমেরিকার ফেলে যাওয়া অস্ত্রগুলোই এখন ইরানের প্রধান শক্তি।
এফ-১৪ টমক্যাট: বিশ্বের একমাত্র দেশ হিসেবে ইরান এখনো আমেরিকার এই দুর্ধর্ষ যুদ্ধবিমানগুলো আকাশে ওড়াচ্ছে। মার্কিন পার্টস ছাড়াই নিজস্ব প্রযুক্তিতে এগুলোকে সচল রেখে পেন্টাগনকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে তারা।
বিজিএম-৭১ টাউ মিসাইল: আমেরিকার তৈরি এই অ্যান্টি-ট্যাংক মিসাইলকে নকল করে ইরান বানিয়েছে ‘তুফান’ মিসাইল। আজ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রণক্ষেত্রে মার্কিন ট্যাংকের যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এই ইরানি ‘তুফান’।
ড্রোনের দুনিয়ায় চুরমার মার্কিন দম্ভ
২০১১ সাল। আকাশ প্রতিরক্ষা ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। আমেরিকার অত্যন্ত গোপনীয় এবং রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম ‘আরকিউ-১৭০ সেন্টিনেল’ স্টিলথ ড্রোনটি অক্ষত অবস্থায় নামিয়ে আনে ইরান। সেই ড্রোনের প্রতিটি নাট-বল্টু খুলে তার রহস্য উদ্ধার করে তেহরান তৈরি করে ফেলে নিজস্ব স্টিলথ ড্রোন ‘শাহেদ-১৭১’।
যুগান্তরের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ইরান এখন শুধু অস্ত্র চুরি বা নকল করছে না, বরং আমেরিকার ডিজিটাল সিগন্যাল হ্যাক করে তাদের ড্রোনগুলোকেই উল্টো পথে চালিত করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। একে সামরিক ভাষায় বলা হচ্ছে ‘সাইবার হাইজ্যাকিং’।
আফগান ও ইরাক যুদ্ধের ‘লুত করা’ অস্ত্র
আফগানিস্তান ও ইরাক থেকে মার্কিন সেনাদের তড়িঘড়ি প্রস্থানের পর ফেলে যাওয়া বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক মার্কিন অস্ত্র এখন তেহরানের ল্যাবে। হামভি থেকে শুরু করে এম-১৬ রাইফেল কিংবা অত্যাধুনিক নাইট ভিশন গগলস—সবই এখন ইরানের নাগালে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব অস্ত্র থেকে সংগৃহীত ডাটা ব্যবহার করে ইরান এমন সব সিস্টেম তৈরি করছে যা মার্কিন সেন্সরকেও ফাঁকি দিতে সক্ষম।
বিশেষজ্ঞের মত
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা যখন কোটি কোটি ডলার খরচ করে একেকটি হাই-টেক অস্ত্র বানাচ্ছে, ইরান তখন মাত্র কয়েক হাজার ডলার খরচ করে সেই অস্ত্রের দুর্বলতা খুঁজে বের করছে। তেহরানের বার্তা পরিষ্কার—আমেরিকা যে অস্ত্র নিয়ে গর্ব করে, সেই অস্ত্র দিয়েই তাদের রক্তক্ষরণ ঘটাতে ইরান এখন পুরোপুরি প্রস্তুত।





















