সম্প্রতি ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া সরাসরি সামরিক সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যকে এক চরম উত্তেজনার দিকে ঠেলে দিয়েছে। শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর তেহরান দ্রুত পাল্টা জবাব দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
এই পরিস্থিতিতে সামরিক বিশ্লেষক ও বিশ্ববাজারের প্রধান প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—ইরানের সামরিক সক্ষমতা আসলে কতটুকু এবং তারা কীভাবে এই শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করছে? আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে ইরানের সামরিক শক্তির মূল স্তম্ভগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি: প্রতিরোধের মেরুদণ্ড
ইরানের সামরিক কৌশলের প্রধান হাতিয়ার হলো তাদের বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার। মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে ইরানের কাছেই সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ও বৃহত্তম ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল সংগ্রহ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
স্বল্প পাল্লার মিসাইল (১৫০-৮০০ কিমি): ফাতেহ ভেরিয়েন্টের জিলফাগার, কিয়াম-১ এবং শাহাব-১/২ মিসাইলগুলো নিকটবর্তী সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত আঘাত হানতে সক্ষম।
মধ্যম পাল্লার মিসাইল (১,৫০০-২,৫০০ কিমি): শাহাব-৩, ইমাদ, খোররামশাহর এবং সেজ্জিল মিসাইলগুলোর পাল্লা ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি পর্যন্ত বিস্তৃত। বিশেষ করে ‘সেজ্জিল’ মিসাইলটি কঠিন জ্বালানি চালিত হওয়ায় এটি অত্যন্ত দ্রুত উৎক্ষেপণ করা যায়।
হাইপারসনিক মিসাইল: ইরান তাদের ‘ফাত্তাহ’ সিরিজের মিসাইলগুলোকে হাইপারসনিক হিসেবে দাবি করে, যা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এবং রাডার ফাঁকি দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।
ড্রোন প্রযুক্তি: কম খরচে বড় আঘাত
ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ইরানের ড্রোন বা চালকবিহীন বিমান বাহিনী এখন যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। ‘শাহেদ’ সিরিজের কামিকাজে ড্রোনগুলো সস্তা কিন্তু কার্যকর। এগুলো একসঙ্গে ঝাঁক বেঁধে (Swarm) আক্রমণ চালিয়ে শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত ও অচল করে দিতে পারে।
হরমুজ প্রণালী ও নৌ-শক্তি
ইরানের অন্যতম বড় শক্তি হলো ভৌগোলিক অবস্থান। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের একটি বিশাল অংশ পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান ইতিমধ্যেই হুমকি দিয়েছে যে, তারা এই প্রণালী দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করতে দেবে না। তাদের অ্যান্টি-শিপ মিসাইল, নৌ-মাইন এবং দ্রুতগামী ছোট বোটগুলো ব্যবহার করে তারা বিশ্ব অর্থনীতির এই লাইফলাইন বন্ধ করে দিতে পারে, যা বিশ্ববাজারে তেলের দাম বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
সারভাইভাল বা টিকে থাকার লড়াই
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সংঘাত ইরানের জন্য কেবল একটি সামরিক যুদ্ধ নয়, বরং এটি তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর তেহরান মনে করছে, এখন যদি তারা কঠোর প্রতিশোধ না নেয় তবে তা দুর্বলতা হিসেবে গণ্য হবে। তাই ইরান কেবল একটি বড় হামলার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদী এবং বহুমুখী আক্রমণের কৌশল গ্রহণ করেছে, যার লক্ষ্য হলো ইসরায়েল এবং অঞ্চলে থাকা মার্কিন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো।
বর্তমানে ইরান তার এই বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার ব্যবহার করে ইসরায়েলের বেইত শেমেশ এবং কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন ঘাঁটিগুলোর দিকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালাচ্ছে। পুরো অঞ্চল এখন এক অনিশ্চিত যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, যেখানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তি মূল ভূমিকা পালন করছে।






















