আকাশপথ, সমুদ্রপথ এবং বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে বিস্তৃত অঞ্চলে। সংঘাতে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৫০ জনের বেশি। এর মধ্যে ইরানে নিহত হয়েছেন ১ হাজার ২৩০ জন। লেবাননে নিহত অন্তত শতাধিক। সংঘাত চলমান থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইরানের ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে আরব দেশগুলোর ব্যবহৃত প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র বা ইন্টারসেপ্টরের মজুদ বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছে সিবিএস নিউজ। অঞ্চলটির অন্তত তিনটি দেশের কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, পরিস্থিতি এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দ্রুত নতুন সরবরাহ পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছে। দেশগুলো আশঙ্কা করছে শিগগিরই নতুন মজুদ না পেলে ইরানি হামলা ঠেকাতে পারবে না তারা। এতে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন নতুন সরবরাহের বিষয়টি দ্রুত এগিয়ে নিতে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বাস্তবে সরঞ্জাম পৌঁছাতে যে গতি প্রয়োজন, তা এখনো দেখা যাচ্ছে না। পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে ইরানের বিপুলসংখ্যক ড্রোন হামলা। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে ইরান শত শত ড্রোন ব্যবহার করেছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। তাদের ধারণা, আঞ্চলিক দেশগুলোর ওপর চাপ তৈরি করতেই ইরান এসব হামলা চালাচ্ছে, যাতে ওই দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ বন্ধের জন্য চাপ দেয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নেতৃত্ব এ ঘাটতির আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছে। বুধবার পেন্টাগনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান বিমান বাহিনীর জেনারেল ড্যান কেইন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় আক্রমণ ও প্রতিরক্ষা—উভয় ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত ‘প্রিসিশন মিউনিশন’ বা নির্ভুল অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে।
এদিকে গতকালও ইসরায়েলসহ উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। গতকাল ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি মার্কিন তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানোর দাবিও জানিয়েছে ইরানের নৌবাহিনী। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা এ তথ্য জানিয়েছে।
ইরানের আধাসরকারি ফারস নিউজ এজেন্সি জানায়, তেহরানের দক্ষিণ-পশ্চিমে পারান্দ শহরের দুটি স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করে। এতে একটি শ্রেণীকক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আশপাশের আবাসিক ভবনেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর আগে ইরানের মিনাব শহরের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলায় অন্তত ১৬৫ শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার কথাও জানানো হয়।
এদিকে আজারবাইজানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া কয়েকটি ড্রোন দেশটির ভূখণ্ডে এসে পড়েছে। এর মধ্যে একটি ড্রোন নাখচিভান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবনে আঘাত করে। আরেকটি ড্রোন শাকারাবাদ গ্রামের একটি স্কুলের কাছে এসে পড়ে। এতে অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে এবং দুজন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটি। হামলার পর আজারবাইজান দক্ষিণ সীমান্তের আকাশসীমার একটি অংশ ১২ ঘণ্টার জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে।
এদিকে ইরানের ক্রমাগত হামলার মুখে কাতারে যুদ্ধবিমান পাঠাচ্ছে যুক্তরাজ্য। দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জানিয়েছেন, কাতারে মোতায়েন ব্রিটিশ স্কোয়াড্রনে যোগ দিতে আরো চারটি অতিরিক্ত ‘টাইফুন’ যুদ্ধবিমান পাঠানো হচ্ছে। সাইপ্রাসে ড্রোন বিধ্বংসী সক্ষমতাসম্পন্ন হেলিকপ্টার পাঠানোর কথাও জানান তিনি। স্টারমার বলেন, ওই অঞ্চলে অবস্থানরত ব্রিটিশ নাগরিক ও মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভূমধ্যসাগরে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর রণতরি ‘এইচএমএস ড্রাগন’ মোতায়েন করা হচ্ছে। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে নাগরিকদের সরিয়ে নেয়ার কাজও জোরদার করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মন্ত্রী হামিশ ফ্যালকনার পার্লামেন্টে বলেছেন, বর্তমান সংকট কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। পরিস্থিতি কয়েক মাস পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকারে নিরাপত্তা দেয়ার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রয়োজনে মার্কিন নৌবাহিনীকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী ট্যাংকারগুলোর নিরাপত্তা দেয়ার নির্দেশ দিতে পারেন। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথ বন্ধ ঘোষণা করেছে এবং সেখানে চলাচলকারী জাহাজে হামলার হুমকি দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে চলাচলকারী তেলবাহী ও কার্গো জাহাজকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশন’ থেকে রাজনৈতিক ঝুঁকি বীমা দেয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা আইনপ্রণেতাদের দেয়া এক গোপন ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, ইরানের ছোড়া সব ড্রোন ভূপাতিত করা সম্ভব নাও হতে পারে। জেনারেল ড্যান কেইনের নেতৃত্বে কর্মকর্তারা বলেন, ইরান হাজার হাজার ‘ওয়ান-ওয়ে’ আক্রমণাত্মক ড্রোন ব্যবহার করছে। অধিকাংশ ড্রোন প্রতিহত করা সম্ভব হলেও বিপুল সংখ্যার সব ক’টি ঠেকানো কঠিন। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র এখন দ্রুত ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বেসামরিক এলাকায় হামলা চালাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই বলেন, এসব হামলার প্রভাব বিশ্ববাজারেও পড়ছে—জ্বালানির দাম বাড়ছে, মুদ্রাবাজার অস্থিতিশীল হচ্ছে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। তিনি বলেন, হামলাকারীরা এমন স্থানকে লক্ষ্যবস্তু করছে যেখানে সর্বোচ্চ প্রাণহানি ঘটতে পারে। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে চান।
ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটিতে তিন হাজার ছয়শর বেশি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানি রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৬৪৩টি স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৩ হাজার ৯০টি বাড়িঘর, ৫২৮টি বাণিজ্যিক কেন্দ্র, ১৩টি চিকিৎসা স্থাপনা এবং নয়টি রেড ক্রিসেন্ট কেন্দ্র। কয়েকটি হাসপাতালও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির তথ্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে তেহরান।
এদিকে ইসরায়েলের হামলায় নিহতের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার থেকে এ পর্যন্ত ১০২ জন নিহত এবং ৬৩৮ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যেই ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজলাল স্টরমিচ বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলকে গাজার মতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার হুমকি দিয়েছেন।
আল জাজিরার লাইভ ট্র্যাকার অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত ইরানে নিহত হয়েছেন ১ হাজার ২৩০ জন। লেবাননে নিহত শতাধিক। এছাড়া ইসরায়েলে ১১, ইরাকে দুই, কুয়েতে চার, বাহরাইনে এক, সংযুক্ত আরব আমিরাতে তিন এবং ওমানে একজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া মার্কিন সামরিক বাহিনীর ছয় সদস্য নিহত হওয়ার খবর রয়েছে। সংঘাত চলমান থাকায় এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।





















