দেশের ট্রাভেল ব্যবসায়িক খাতে চলমান মহাদুর্যোগের জন্য অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি (ওটিএ) সৃষ্টিকারী গত এক দশকের অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব) নেতৃবৃন্দকে দায়ী করছেন খাতটির সাধারণ ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, আটাব কমিটির ভুল নীতি, উদাসীনতা এবং কার্যকর পদক্ষেপের অভাবেই ‘ফ্লাইট এক্সপার্ট’ ও ‘ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনাল’-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের শত শত কোটি টাকা নিয়ে উধাও হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
একের পর এক ওটিএ প্রতিষ্ঠানের পতনের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন ফোরামে আটাবের বর্তমান ও সাবেক কমিটির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হচ্ছে। অনেক ট্রাভেল এজেন্টের মালিক অভিযোগ করছেন, আটাব কমিটি শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করেছে এবং সাধারণ সদস্যদের বা গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষায় পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। তাদের মতে, আটাব কার্যত পুরো ট্রাভেল ব্যবসাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।
মূল অভিযোগগুলো কী?
ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীদের মতে, গত দশ বছরে আটাবের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন, যা আজকের এই সংকট তৈরি করেছে:
১. ওটিএ-এর অনৈতিক ব্যবসায়িক মডেলকে প্রশ্রয়: অভিযোগ উঠেছে, আটাব নেতারা ‘ডিসকাউন্ট’ বা ‘কমে বিক্রি’ করার অসুস্থ প্রতিযোগিতাকে দেখেও না দেখার ভান করেছেন। ফ্লাইট এক্সপার্ট বা ফ্লাই ফারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এয়ারলাইন্সের নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও কম মূল্যে টিকিট বিক্রি করে বাজার ধরার চেষ্টা করেছে। এই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসায়িক মডেল যে দীর্ঘমেয়াদে টিকবে না, তা জানা সত্ত্বেও আটাব তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
২. নিয়ন্ত্রক ভূমিকা পালনে ব্যর্থতা: ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর অভিভাবক সংগঠন হিসেবে আটাবের দায়িত্ব ছিল একটি সুশৃঙ্খল বাজার তৈরি করা। কিন্তু তারা কোনো কার্যকর নীতিমালা বা মনিটরিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ফলে, যে কেউ চাইলেই একটি আকর্ষণীয় ওয়েবসাইট খুলে গ্রাহকদের অগ্রিম টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
৩. সাধারণ এজেন্টদের স্বার্থ উপেক্ষা: অনেক ট্রাভেল এজেন্ট অভিযোগ করছেন যে, আটাব নেতারা মুষ্টিমেয় কিছু বড় ওটিএ-এর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে সাধারণ হাজার হাজার এজেন্টের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়েছেন। কম দামে টিকিট বিক্রির অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে সৎভাবে ব্যবসা করা ক্ষুদ্র ও মাঝারি এজেন্টরা বাজার থেকে ছিটকে পড়েছেন।
একজন সিনিয়র ট্রাভেল এজেন্ট নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। গত দশ বছর ধরে আটাবের নেতৃত্বে যারা ছিলেন, তারা এই ওটিএ সংস্কৃতি তৈরি করেছেন। তারা যদি শুরুতেই লাগাম টেনে ধরতেন, তাহলে আজ হাজার হাজার গ্রাহক এবং শত শত এজেন্টকে পথে বসতে হতো না।”
তিনি আরও বলেন, “যখন এই প্রতারক চক্রগুলো পালিয়ে যায়, তখন কি সাধারণ ব্যবসায়ী বা গ্রাহকদের টাকা উদ্ধার করা যায়? যায় না। দুই হাজার টাকা লাভ করতে গিয়ে আমরা দুই কোটি টাকা এই প্রতারকদের হাতে তুলে দিচ্ছি। ব্যবসা চলে ব্যবসায়ীর নিয়মে, পাবলিকের কথায় নয়। যারা নিয়মের বাইরে গিয়ে ব্যবসা করেছে, তারা সবাই আজ বিপদে পড়েছে।”
এই পরিস্থিতিতে, সাধারণ ট্রাভেল এজেন্টরা ব্যবসার ধরন পাল্টানোর এবং অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে एकजुट হয়ে আওয়াজ তোলার আহ্বান জানাচ্ছেন। তাদের দাবি, আটাবের বর্তমান কমিটিকে এই সংকটের দায় নিয়ে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়, তা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করতে হবে।




















