দেশের জীবন বীমা খাতের ওপর গ্রাহকদের আস্থাহীনতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রতিশ্রুত সেবা না পাওয়া, দাবি আদায়ে হয়রানি এবং এজেন্টদের দুর্নীতির কারণে বীমা পলিসি তামাদি বা বন্ধ করে দেওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) সারা দেশে ৩ লাখ ২৫ হাজার ২৬৬ জন গ্রাহক তাদের জীবন বীমা পলিসি বন্ধ (তামাদি) করে দিয়েছেন।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আলোচ্য সময়ে সবচেয়ে বেশি পলিসি তামাদি হয়েছে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের। কোম্পানিটির ৭৩ হাজার ২৬৭টি পলিসি তামাদি হয়েছে। এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ন্যাশনাল লাইফ, যার ৪৬ হাজার ৭৬৩টি পলিসি বন্ধ হয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে রয়েছে যথাক্রমে ডেলটা লাইফ (২৭,৩৭৬টি) এবং মেটলাইফ বাংলাদেশ (২০,২৭৮টি)।
বীমা ব্যবসায় ‘তামাদি’ একটি বহুল পরিচিত শব্দ। পলিসিহোল্ডার যদি সময়মতো প্রিমিয়াম জমা না দেন, তবে নির্দিষ্ট সময় পর পলিসিটি তামাদি বা অকার্যকর হয়ে যায়। এর ফলে গ্রাহক বীমা কাভারেজ থেকে বঞ্চিত হন এবং অনেক ক্ষেত্রে জমাকৃত টাকাও ফেরত পান না।
সংকট দীর্ঘ হচ্ছে
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো বীমা খাতও দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও নানা কারণে এই সম্ভাবনাময় খাতটি ‘অনাস্থায়’ নিমজ্জিত। বছর বছর লাখ লাখ পলিসি তামাদি বা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই সংকট আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
আইডিআরএ-এর তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে তামাদি হওয়া জীবন বীমা পলিসির সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ৪২ হাজার। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ৪৯ হাজার ১৬৮ জন। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত মোট ২৬ লাখের বেশি জীবন বীমা পলিসি বাতিল বা তামাদি হয়েছে। এর ফলে ২০০৯ সালে দেশে মোট সক্রিয় পলিসির সংখ্যা যেখানে এক কোটি ১২ লাখ ছিল, তা ২০২৩ সালে কমে ৮৫ লাখ ৮৮ হাজারে দাঁড়িয়েছে।
দাবি নিষ্পত্তিতেও চরম ব্যর্থতা
পলিসি তামাদি হওয়ার পাশাপাশি বীমা দাবি নিষ্পত্তিতেও কোম্পানিগুলোর চরম ব্যর্থতার চিত্র উঠে এসেছে। আইডিআরএ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন প্রান্তিকে জীবন বীমা কোম্পানিগুলো মোট উত্থাপিত বীমা দাবির মাত্র ৩৫ শতাংশ নিষ্পত্তি করেছে। গ্রাহকদের ৬৫ শতাংশ বীমা দাবিই অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। এই অনাদায়ী অর্থের পরিমাণ বিপুল। জুন প্রান্তিক শেষে মোট বীমা দাবির পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৫৭৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা, যার মধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৯৪৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
কেন পলিসি বন্ধ করছেন গ্রাহকরা?
বীমা খাত সংশ্লিষ্টরা পলিসি তামাদি হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণকে দায়ী করছেন:
১. এজেন্টদের উদাসীনতা: জীবন বীমা কোম্পানির প্রতিনিধিরা (এজেন্ট) নতুন পলিসি খোলার জন্য যতটা মনোযোগী থাকেন, পরের বছর থেকে প্রিমিয়াম আদায়ের জন্য সেই মনোযোগ ধরে রাখেন না। ২. কমিশন কাঠামো: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. হাসিনা শেখের মতে, এর বড় কারণ কমিশন কাঠামো। এজেন্টরা প্রথম বর্ষে বড় অংকের কমিশন পেলেও দ্বিতীয় বর্ষে সেই সুযোগ থাকে না। ফলে তারা পুরোনো পলিসি রক্ষার বদলে নতুন পলিসি বিক্রিতে বেশি মনোযোগ দেন। ৩. প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও দুর্নীতি: কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এছাড়া, অসাধু এজেন্টদের বিরুদ্ধে গ্রাহকের কাছ থেকে প্রিমিয়াম নিয়ে তা আত্মসাৎ করার অভিযোগও রয়েছে।
বীমা মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) নির্বাহী সদস্য এস. এম. নুরুজ্জামান বলেন, “অর্থনৈতিক উন্নয়ন চাইলে বীমাকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। পলিসি তামাদি রোধে সবার আগে কোম্পানিকেই দায়িত্ব নিতে হবে। সময়মতো বীমা দাবি পরিশোধ এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে পারলে পলিসি তামাদির হার কমে যাবে।”




















