২০২১ সালের ১ জুলাই। দেশে পরীক্ষামূলকভাবে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালু করেছিল বিটিআরসি। তখন অবৈধ মোবাইল ফোন বন্ধের ঘোষণা এলেও আজকের মতো কোনো লংমার্চ, ধর্মঘট বা আন্দোলনের হুমকি দেখা যায়নি। মোবাইল ব্যবসায়ীরা তখন কোনো ‘দাবি’ নিয়ে রাজপথে নামেননি।
অথচ ২০২৫ সালে এসে সেই একই এনইআইআর বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তে অবৈধ ফোন ব্যবসায়ীরা কেন এত মরিয়া? কেন এখন তারা ঢাকা লংমার্চের ডাক দিচ্ছে?
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এর পেছনের আসল রহস্য। বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২১ সালে অবৈধ ফোন ব্যবসায়ীদের কোনো আন্দোলনের প্রয়োজন ছিল না, কারণ তখন তাদের সুরক্ষাদাতা ছিল খোদ সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও নেতারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র তথ্য বলছে, ২০২১ সালে এনইআইআর চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ছিল কেবল ‘কাগজে-কলমে’। ১. আওয়ামী কানেকশন: তৎকালীন অবৈধ ফোন মার্কেটের গডফাদারদের সঙ্গে আইসিটি মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসির অসাধু কর্মকর্তাদের গভীর সখ্যতা ছিল। সিন্ডিকেটের নেতারা নিয়মিত মাসোহারা পৌঁছে দিতেন মন্ত্রীপাড়ায়।
২. মানিলন্ডারিংয়ের রুট: অবৈধ ফোন ছিল কালো টাকা সাদা করা এবং বিদেশে টাকা পাচারের অন্যতম মাধ্যম। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশেই তখন এনইআইআর-এর সার্ভার কঠোর করা হয়নি। ফলে ব্যবসায়ীরা জানতেন, আইন পাস হলেও তাদের ব্যবসা বন্ধ হবে না। তাই তারা কোনো দাবি বা আন্দোলন করার প্রয়োজন মনে করেননি।
৩. নিজেদের লোক: চট্টগ্রামের আরিফুর রহমান বা ঢাকার মোতালেব প্লাজার সিন্ডিকেট নেতারা তখন সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাওয়ার প্রশ্নই ছিল না।
পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বিশেষ করে আইসিটি উপদেষ্টা ফয়েজ আহমদ তৈয়ব সিন্ডিকেটের সঙ্গে কোনো আপস করছেন না।
১. রাজনৈতিক এতিম: ৫ আগস্টের পর সিন্ডিকেটের রাজনৈতিক ‘ছাতা’ সরে গেছে। এখন আর ঘুষ দিয়ে নীতি পরিবর্তন করা যাচ্ছে না।
২. বাস্তব বাধার মুখে: সরকার এবার সত্যিই এনইআইআর কার্যকর করতে যাচ্ছে, যা সিন্ডিকেটের ২০ হাজার কোটি টাকার অবৈধ বাজার ধসিয়ে দেবে।
৩. অযৌক্তিক দাবি: ২০২১ সালে যেসব ব্যবসায়ী এনইআইআর-কে স্বাগত জানিয়েছিলেন বা চুপ ছিলেন, তারাই এখন ‘ব্র্যান্ড শপ বন্ধ করা’ বা ‘অবৈধ ফোন বিক্রির সময় চাওয়া’র মতো অযৌক্তিক দাবি তুলছেন।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২১ সালে ব্যবসায়ীদের কোনো ‘দাবি’ না থাকা এবং ২০২৫ সালে এসে আন্দোলনের ডাক দেওয়াই প্রমাণ করে—এই আন্দোলন ‘ব্যবসায়িক অধিকার’ আদায়ের জন্য নয়, বরং ‘চুরির স্বাধীনতা’ বজায় রাখার জন্য।
বিটিআরসির সাবেক এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তখন উপর থেকে ফোন আসত সার্ভার স্লো রাখার জন্য। আর এখন সিন্ডিকেট দেখছে তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, তাই তারা লংমার্চের মতো কর্মসূচির নাটক সাজাচ্ছে।”
সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলছে, ২০২১ সালে যা ‘শৃঙ্খলার অংশ’ ছিল, ২০২৫ সালে তা কীভাবে ‘ব্যবসায়ীদের পেটে লাথি’ হয়? মূলত অবৈধ সুবিধা বন্ধ হওয়ার আক্রোশ থেকেই সিন্ডিকেটের এই আস্ফালন।






















