দেশের অবৈধ মোবাইল ফোন বাজারের অন্যতম শীর্ষ সিন্ডিকেট হোতা এবং ‘ড্যাজেল’ (Dazzle)-এর স্বত্বাধিকারী দিদারুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্তে উঠে এসেছে, অবৈধভাবে মোবাইল ফোন আমদানি ও হুন্ডির মাধ্যমে তিনি এবং তার সিন্ডিকেট বছরে প্রায় ৩০০০ থেকে ৫০০০ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করছেন।
শূন্য থেকে শিখরে: নেপথ্যে কালো টাকা ও রাজনৈতিক প্রভাব
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা দিদারুল ইসলাম খানের উত্থান অনেকটা সিনেমার গল্পের মতো। মাত্র সাত বছরের ব্যবধানে তিনি দেশের বিলাসবহুল শপিং মলগুলোতে ৯টি বিশাল শোরুমের মালিক হয়েছেন। বসুন্ধরা সিটি ও যমুনা ফিউচার পার্কসহ তার প্রতিটি শোরুমের মূল্য ৫ থেকে ১২ কোটি টাকা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দিদারুলের এই বিত্তবৈভবের নেপথ্যে ছিলেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য আরশাদুল আলম বাচ্চু। অভিযোগ রয়েছে, বাচ্চুসহ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার কালো টাকা সাদা করতেই দিদারুলকে ব্যবহার করা হয়েছে। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর বাচ্চু দুবাই পালিয়ে গেলে দিদারুল নিয়মিত দুবাই যাতায়াত শুরু করেন এবং পাচারকৃত অর্থ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেন।
চুরাচালান ও কর ফাঁকির মহোৎসব
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডেজেল বছরে অন্তত ৫০০ কোটি টাকার অবৈধ মোবাইল বিক্রি করে। দিদারুল মূলত দুবাই ও ভারত থেকে চোরাচালান নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বছরে প্রায় ৩০০০ কোটি টাকার মোবাইল আমদানি করেন। এসব পণ্যের মূল্য পরিশোধ করা হয় সম্পূর্ণ অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে। এর ফলে সরকার বছরে প্রায় ১৬০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, বেশিরভাগ মোবাইল বক্স খোলা অবস্থায় আনা হয় এবং পরে ড্যাজেলের কর্মীরা তা প্যাকেটজাত করে ‘ইনট্যাক্ট’ হিসেবে বিক্রি করে। এছাড়া সফটওয়্যার ব্যবহার করে ব্যবহৃত বা রিফারবিশড ফোনকে নতুন হিসেবে চালানোর গুরুতর অভিযোগও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।
এনইআইআর (NEIR) নিয়ে দ্বিচারিতা ও সিন্ডিকেটের ছক
সরকারের এনইআইআর বা মোবাইল ফোন নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালুর উদ্যোগে দিদারুল ইসলাম খান দ্বিমুখী ভূমিকা পালন করছেন। একদিকে তিনি সাধারণ ও ক্ষুদ্র মোবাইল ব্যবসায়ীদের সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে উস্কানি দিচ্ছেন, অন্যদিকে নিজে গোপনে বিটিআরসি ও এনবিআর কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে ‘বৈধ আমদানির লাইসেন্স’ বাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
তদন্তে জানা গেছে, অন্যান্য ব্যবসায়ীরা যখন ফেসবুকে দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিচ্ছেন, তখন ডেজেলের পেজে লেখা হচ্ছে ‘অনিবার্য কারণবশত বন্ধ’। এমনকি নিজের কর্মীদের সরকারবিরোধী কোনো কথা বলতে নিষেধ করেছেন তিনি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তার মূল উদ্দেশ্য হলো—সরকারকে চাপে ফেলে শুল্ক কমানো এবং গুটিকয়েক মাফিয়ার (যাদের মধ্যে ডেজেল অন্যতম) জন্য লাইসেন্স বের করে বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করা।

প্রতারণা, শোষণ ও বিলাসিতা
গ্রাহকদের সাথে প্রতারণার নতুন ফাঁদ হিসেবে ‘ড্যাজেল কেয়ার প্লাস’ নামে একটি ইন্স্যুরেন্স সার্ভিস চালু করেছেন তিনি। মোবাইল নষ্ট হওয়ার ভয় দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক বাড়তি টাকা আদায় করা হয়। এছাড়া বিক্রয়কর্মীদের মূল সনদপত্র আটকে রেখে জিম্মি করে অনৈতিক কাজ করানোর অভিযোগও রয়েছে।
বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত দিদারুল বিএমডব্লিউ এক্স-৫ (ঢাকা মেট্রো ঘ ১৭-২৫০৫) ও হ্যারিয়ারের মতো দামি গাড়ি ব্যবহার করেন। প্রচারণার জন্য সালমান মুক্তাদির ও সুভাশিষ ভৌমিকের মতো সেলিব্রেটিদের পেছনে কোটি টাকা খরচ করেন তিনি।
পাচারকৃত অর্থে ইউরোপে নাগরিকত্ব
তদন্তে আরও জানা গেছে, দিদারুল ইসলাম খান পাচার করা অর্থ দিয়ে ইউরোপের অন্তত দুটি দেশের নাগরিকত্ব কিনেছেন। তার স্ত্রী, সন্তান ও পিতামাতাসহ যেকোনো সময় দেশ ত্যাগের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এ বিষয়ে দুদক, বিএফআইইউ (BFIU), সিআইডি এবং এনবিআরের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ তদন্ত দল কাজ করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দিদারুল শুধু সরকারের রাজস্বই ফাঁকি দিচ্ছেন না, বরং ২০ হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে জিম্মি করে নিজের আখের গোছাচ্ছেন। তাই এই মামলাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
এসব বিষয় নিয়ে ‘ড্যাজেল’ (Dazzle)-এর স্বত্বাধিকারী দিদারুল ইসলাম খান বক্তব্যের জন্য ফোনে ম্যাসেজ পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।






















