বাংলাদেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট বাজারের এক ভয়ংকর জালিয়াতির চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালুর পর দেখা যাচ্ছে, দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে বর্তমানে লক্ষ লক্ষ ক্লোন বা নকল আইএমইআই (IMEI) নম্বর সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে একটি বিশেষ জালিয়াতি করা নম্বর ব্যবহার করছে প্রায় পৌনে চার কোটির বেশি গ্রাহক।
একটি নম্বরেই কোটি গ্রাহক
বিটিআরসি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ‘99999999999999’—এই একটিমাত্র ভুয়া আইএমইআই নম্বরে গত ১০ বছরে রেকর্ড ৩ কোটি ৯১ লাখ ২২ হাজার ৫৩৪টি ভিন্ন ভিন্ন সিম ও ডকুমেন্ট আইডি ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়াও ‘0000000000000’ বা ‘1111111111111’-এর মতো প্যাটার্নযুক্ত লক্ষ লক্ষ ফেক আইএমইআই বর্তমানে নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে রয়েছে।
ডুপ্লিকেট আইএমইআই-এর ভয়াবহ তালিকা:
শীর্ষ কিছু জালিয়াতি করা নম্বরের পরিসংখ্যান দেখলে চমকে উঠতে হয়:
440015202000: এই নম্বরে সচল আছে ১৯ লাখ ৪৯ হাজারেরও বেশি ডিভাইস।
35227301738634: এতে সচল আছে প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ ফোন।
0 (এক ডিজিটের শূন্য): এই একটিমাত্র সংখ্যা আইএমইআই হিসেবে ব্যবহার করছে ৫ লাখ ৮৬ হাজারের বেশি হ্যান্ডসেট।
বন্ধ হবে না, তবে চিহ্নিত হবে ‘গ্রে’ হিসেবে
ডাক ও টেলিযোগাযোগ উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়ব জানিয়েছেন, এই বিপুল সংখ্যক গ্রাহক মূলত প্রতারণার শিকার। এসব ফোনের রেডিয়েশন টেস্ট বা এসএআর (SAR) টেস্টিং হয়নি, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এড়াতে এখনই এসব ফোন বন্ধ করা হবে না। এগুলোকে সিস্টেমে ‘গ্রে’ (Grey) ক্যাটাগরিতে ট্যাগ করা হবে।
অপরাধের স্বর্গরাজ্য ‘অবৈধ ফোন’
পরিসংখ্যান বলছে, ডিজিটাল জালিয়াতি ও অপরাধের মূল হাতিয়ার এই অনিবন্ধিত ফোনগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য: ৭৩ শতাংশ ডিজিটাল জালিয়াতি ঘটে অনিবন্ধিত ডিভাইসে।
ই-কেওয়াইসি (e-KYC) জালিয়াতি: ২০২৩ সালে ৮৫ শতাংশ ই-কেওয়াইসি জালিয়াতি হয়েছে অবৈধ বা পুনঃপ্রোগ্রাম করা ফোনে।
উদ্ধারহীন চোরাই ফোন: ২০২৩ সালে প্রায় ১.৮ লাখ ফোন চুরির রিপোর্ট হলেও আইএমইআই জটলা ও জালিয়াতির কারণে তার অধিকাংশই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
নাগরিক অধিকার ও প্রতারণা
বাংলাদেশে আন-অফিশিয়াল বা নতুন ফোনের নামে যেভাবে কোটি কোটি নকল ফোন বিক্রি করা হয়েছে, তাকে ‘অভাবনীয় ও নজিরবিহীন প্রতারণা’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই চক্রের লাগাম টানতেই এনইআইআর ব্যবস্থা কঠোরভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে বিটিআরসি সিসিটিভি বা আইওটি (IoT) ডিভাইসগুলোকে আলাদাভাবে ট্যাগ করার কাজ শুরু করেছে যাতে বৈধ আইওটি ডিভাইসগুলো এই জটলা থেকে মুক্ত থাকতে পারে।
আপনি যদি এখন কোনো নতুন ফোন কিনতে চান, তবে এই বিশাল জালিয়াতি চক্র থেকে বাঁচতে অবশ্যই *#০৬# ডায়াল করে আইএমইআই নম্বরটি বিটিআরসি-র ডাটাবেজে (১৬০০২ নম্বরে এসএমএস করে) যাচাই করে নিন। আপনার বর্তমান ফোনটি ‘গ্রে’ লিস্টে আছে কি না, তা নিয়ে কি আপনি চিন্তিত?






















