দেশে অবৈধ হ্যান্ডসেট বন্ধ এবং ৯৬ হাজার কোটি টাকার অর্থ পাচার রোধে সরকার ‘ন্যাশনাল ইক্যুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার’ (NEIR) বা এনইআইআর পূর্ণাঙ্গ কার্যকর করার উদ্যোগ নিলেও, একে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক বিতর্কিত আন্দোলন। তবে বাজার বিশ্লেষক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আন্দোলনের সিংহভাগই দাঁড়িয়ে আছে ভুল তথ্য এবং জনসাধারণের বিভ্রান্তির ওপর।
আন্দোলনের নেপথ্যে কি সাধারণ মানুষ না কি সিন্ডিকেট?
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এনইআইআর বিরোধী যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তার পেছনে বড় একটি ভূমিকা রাখছে অবৈধ মোবাইল আমদানিকারক সিন্ডিকেট। বছরে যে ৯৬ হাজার কোটি টাকার অবৈধ বাজার রয়েছে, এনইআইআর চালু হলে সেই বিশাল কালো টাকার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে—এই আতঙ্ক থেকেই সাধারণ ক্রেতাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
আন্দোলনের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে তিনটি বড় ভুল ধারণা, যা সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করছে:
১. উপহার বা বিদেশ থেকে আনা ফোন বন্ধ হয়ে যাবে: আন্দোলনকারীদের দাবি, প্রবাসীদের পাঠানো ফোন আর দেশে চলবে না। অথচ বিটিআরসির নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশ থেকে আনা ফোন পাসপোর্টের তথ্য দিয়ে খুব সহজেই অনলাইনে নিবন্ধন করা সম্ভব। এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বা সরকার নির্ধারিত নামমাত্র শুল্কে বৈধ করার সুযোগ রয়েছে।
২. ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন: আন্দোলনে প্রচার করা হচ্ছে যে, এনইআইআর-এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্যে নজরদারি করা হবে। কিন্তু প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, এই সিস্টেমটি কেবল ফোনের আইএমইআই (IMEI) নম্বরের একটি ডাটাবেজ। এর সাথে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত কল রেকর্ড বা তথ্যের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি কেবল নিশ্চিত করে যে হ্যান্ডসেটটি চোরাই পথে আসা কি না।
৩. বাজার সিন্ডিকেট ও দাম বৃদ্ধি: বলা হচ্ছে, এনইআইআর চালু হলে ফোনের দাম দ্বিগুণ হবে। বাস্তবতা হলো, অবৈধ ফোনের কারণে সরকার বিপুল রাজস্ব হারানোয় বৈধ ফোনের ওপর শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। শুল্ক কমানো হলে অফিসিয়াল ফোনের দাম উল্টো কমার কথা, কিন্তু অবৈধ ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে জনমনে ভয় ঢোকাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এনইআইআর-এর বিরুদ্ধে আন্দোলন মূলত ৯৬ হাজার কোটি টাকার ‘হুন্ডি’ ও ‘অর্থ পাচার’ চক্রকে সুরক্ষা দেওয়ার একটি অপচেষ্টা। এই সিস্টেম কার্যকর হলে প্রতিটি ফোনের পেমেন্ট এলসির মাধ্যমে হতে হবে, যা অবৈধভাবে বিদেশে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেবে।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, “পৃথিবীর অনেক দেশেই এই সিস্টেম কার্যকর আছে। এটি কেবল গ্রাহকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং মোবাইল চুরি রোধ করে। সাধারণ মানুষ যদি বুঝতে পারে যে এটি তাদের উপকারের জন্য এবং ফোনের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য, তবে এই আন্দোলনের কোনো যৌক্তিকতা থাকে না।”
ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন মূলত দেশের অর্থনীতিকে ডিজিটাল শৃঙ্খলায় আনার পথে একটি বাধা। ৯৬ হাজার কোটি টাকার বিশাল অর্থ পাচার ঠেকাতে এনইআইআর-এর বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।






















