স্বর্ণ যদি ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে দেশে আনা হয়, তবে আমরা তাকে কোনো দ্বিধা ছাড়াই ‘চোরাচালান’ বলি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেটিকে জব্দ করে এবং বহনকারীকে চোরাকারবারি হিসেবে জেলে পাঠায়। কিন্তু একই কায়দায় যখন হাজার হাজার কোটি টাকার মোবাইল ফোন ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে দেশে আনা হয়, তখন আমরা একে ‘আন-অফিশিয়াল ফোন’ বলে একটি ভদ্রতার পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখি।
বাস্তবতা হলো, পণ্যের ধরন আলাদা হলেও অপরাধের ধরন একই। নীতি ও আইনের দৃষ্টিতে স্বর্ণ আর মোবাইলের চোরাচালানের মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই।
ভাষার কারসাজিতে অপরাধের লঘুকরণ
সমাজে ‘আন-অফিশিয়াল’ শব্দটি এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে যেন এটি কোনো বড় অপরাধ নয়, বরং বিকল্প একটি ব্যবস্থা। কিন্তু এই শব্দটির আড়ালে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তিনটি বড় অপরাধ:
১. রাষ্ট্রীয় রাজস্ব লুণ্ঠন: বছরে ৯৬ হাজার কোটি টাকার বাজার থেকে সরকার যে হাজার হাজার কোটি টাকা ভ্যাট ও ট্যাক্স পাওয়ার কথা ছিল, এই ব্যবসায়ীরা তা সরাসরি আত্মসাৎ করছে।
২. অন্যায্য প্রতিযোগিতা: যারা কোটি কোটি টাকা ট্যাক্স দিয়ে বৈধভাবে ব্যবসা করছেন, এই চোরাকারবারিরা ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে তাদের ব্যবসা ধ্বংস করে দিচ্ছে।
৩. অর্থ পাচার: প্রতিটি ‘আন-অফিশিয়াল’ ফোনের পেমেন্ট হচ্ছে হুন্ডির মাধ্যমে, যা সরাসরি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে আঘাত করছে।
স্বর্ণ বনাম মোবাইল: আইনের বৈষম্য কোথায়?
রাস্তায় কারো কাছে অবৈধ স্বর্ণ পাওয়া গেলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, কিন্তু দোকানে হাজার হাজার অবৈধ মোবাইল ফোন সাজিয়ে রাখলেও আমাদের সমাজ ও প্রশাসন তাকে ‘ব্যবসায়ী’ হিসেবেই গণ্য করে। এই ‘নরমালাইজেশন’ বা অপরাধকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতিই আজ ৯৬ হাজার কোটি টাকার এই পাহাড়সম অবৈধ বাজার তৈরি করেছে।
ব্যবসায়ী না কি চোরাকারবারি?
যিনি রাষ্ট্রের আইন মেনে ব্যবসা করেন না, বরং চোরাচালান প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে পণ্য বাজারে ছাড়েন—আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি একজন ‘চোরাকারবারি’। ‘আন-অফিশিয়াল মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী’ কথাটি মূলত একটি ভদ্র ভাষার আড়াল মাত্র।
এনইআইআর (NEIR) নিয়ে চলমান অস্থিরতা আসলে সাধারণ মানুষের কোনো সমস্যা নয়, বরং এটি সেই ১৫০০ চোরাকারবারির অস্তিত্বের সংকট। তাদের এই চোরাচালান ব্যবসাকে আর ‘ব্যবসা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। স্বর্ণের চোরাচালান রোধে রাষ্ট্র যেমন আপসহীন, মোবাইলের ক্ষেত্রেও একই মনোভাব দেখানো এখন সময়ের দাবি।






















