সারাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক থাকলেও রাজধানীর অভিজাত শপিং মল যমুনা ফিউচার পার্ক, বসুন্ধরা সিটি এবং চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারের মোবাইল মার্কেটগুলোতে হঠাৎ স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, বিটিআরসি কর্তৃক এনইআইআর (NEIR) ব্যবস্থা কঠোর করার ঘোষণা এবং অবৈধ ফোনের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানের আতঙ্কে এই মার্কেটগুলোর সিন্ডিকেট নেতারা দোকান বন্ধ রেখে আত্মগোপন করছেন।
তদন্তে জানা গেছে, বাংলাদেশে চোরাই ও অবৈধ ফোনের বাণিজ্যের মূল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র হলো চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজার। একে বলা হয় ‘চোরাই মোবাইলের স্বর্গরাজ্য’। যমুনা ফিউচার পার্ক এবং বসুন্ধরা সিটির বেশিরভাগ বড় অবৈধ ফোন আমদানিকারক ও সিন্ডিকেট নেতাদের মূল ব্যবসা এই রিয়াজউদ্দিন বাজার কেন্দ্রিক। ভারত, দুবাই এবং মালয়েশিয়া থেকে চোরাই পথে আসা ফোনের একটি বিশাল অংশ প্রথমে চট্টগ্রামে পৌঁছায় এবং সেখান থেকে তা ঢাকা ও সিলেটের বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
চোরাই ফোনের এই বিশাল নেটওয়ার্ক কেবল ঢাকা ও চট্টগ্রামেই সীমাবদ্ধ নয়। সিলেটের করিম উল্লাহ মার্কেট এই অঞ্চলের চোরাই ও অবৈধ ফোনের প্রধান ‘হাব’ হিসেবে পরিচিত। বিদেশ থেকে সরাসরি আসা এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চুরি হওয়া দামি ফোনগুলো এখানে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি হয়।
রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি ও যমুনা ফিউচার পার্কের মতো চাকচিক্যময় মার্কেটে শোরুম খুলে বসে থাকা অনেক ব্যবসায়ী মূলত এই চোরাই সিন্ডিকেটের অংশ। রাস্তায় ছিনতাই হওয়া বা ঘর থেকে চুরি হওয়া প্রিমিয়াম স্মার্টফোনগুলো (আইফোন, স্যামসাং এস-সিরিজ) এই মার্কেটগুলোতে এনে ‘আন-অফিশিয়াল’ বা ‘রিফারবিশড’ হিসেবে চড়া দামে বিক্রি করা হয়। সাধারণ ক্রেতারা বিশ্বাসযোগ্যতার খাতিরে এসব বড় মার্কেট থেকে ফোন কিনে প্রতারিত হচ্ছেন।
কেন এই হঠাৎ বন্ধ?
বিশ্লেষকরা বলছেন, এনইআইআর চালু হওয়ার অর্থ হলো এই ২২ জনের সিন্ডিকেটের ব্যবসা পুরোপুরি ধ্বংস হওয়া।
আইএমইআই ব্লকিং: এনইআইআর চালু হলে চোরাই ফোন সচল করা অসম্ভব হয়ে যাবে।
স্টক লুকানো: বিটিআরসি ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অতর্কিত অভিযান এড়াতে সিন্ডিকেট নেতারা তাদের অবৈধ স্টক সরিয়ে নিতে এবং নিজেদের নিরাপদ রাখতে মার্কেট বন্ধের নাটক সাজাচ্ছেন।
চাপে রাখার কৌশল: মার্কেট বন্ধ রেখে তারা সরকারকে চাপে ফেলতে চায় যাতে এনইআইআর বাস্তবায়ন পিছিয়ে যায়।
সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলছেন, যদি ব্যবসা বৈধ হয় তবে এনইআইআর নিয়ে ভয় কেন? অস্ট্রেলিয়া বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোতে সেন্ট্রাল ডাটাবেজ থাকায় সেখানে চোরাই ফোন চলে না। বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকরা এই নিয়মকে স্বাগত জানালেও রিয়াজউদ্দিন বাজার ও বসুন্ধরা সিটির ‘চোরাকারবারিরা’ এর তীব্র বিরোধিতা করছে।
৯৬ হাজার কোটি টাকার এই চোরাই ও অবৈধ ফোনের সাম্রাজ্য মূলত চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা হয়ে সিলেট পর্যন্ত বিস্তৃত। রিয়াজউদ্দিন বাজারের সেই ‘ডার্ক ওয়েব’ ভেঙে দিতে না পারলে এবং এনইআইআর পূর্ণাঙ্গ কার্যকর না হলে সাধারণ মানুষের পকেটের ও দেশের অর্থনীতির এই রক্তক্ষরণ বন্ধ হবে না।





















