চট্টগ্রামের মোবাইল ব্যবসায়ীরা, বিশেষ করে রিয়াজউদ্দিন বাজার কেন্দ্রিক সিন্ডিকেট কেন এনইআইআর (NEIR) বা মোবাইল নিবন্ধন ব্যবস্থার সবচেয়ে বেশি বিরোধী, তার পেছনে গভীর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কারণ রয়েছে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য এর আলোকে এর প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. চোরাই ও অবৈধ ফোনের ‘সেফ হ্যাভেন’ ধ্বংস হওয়া
চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারকে বলা হয় বাংলাদেশের চোরাই ও অবৈধ মোবাইলের সবচেয়ে বড় আস্তানা। দুবাই, ভারত ও মালয়েশিয়া থেকে সমুদ্র, স্থলপথে ও আকাশ পথে আসা অবৈধ ফোনের একটি বিশাল অংশ প্রথমে চট্টগ্রামে পৌঁছায়। এনইআইআর চালু হলে এই ফোনগুলো দেশের কোনো সিমে চলবে না। ফলে রিয়াজউদ্দিন বাজার কেন্দ্রিক শত শত কোটি টাকার স্টক রাতারাতি ‘কাঁচ ও প্লাস্টিকের টুকরো’তে পরিণত হবে। এই বিশাল আর্থিক ক্ষতির ভয়েই তারা সবচেয়ে বেশি সোচ্চার।
২. ভারতের সাথে আন্তঃসীমান্ত চোরাচালান সিন্ডিকেট
আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতের কাজিম এবং বাংলাদেশের বদরউদ্দিন সিন্ডিকেটের মতো চক্রগুলো ভারতীয় চোরাই ফোন সিলেটে এনে কুরিয়ারের মাধ্যমে চট্টগ্রামে পাঠায়। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা এই ফোনগুলো সংগ্রহ করে দক্ষিণ অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়। এনইআইআর চালু হলে আইএমইআই (IMEI) ম্যাচ না করায় এই আন্তঃসীমান্ত ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।
৩. ২২ জনের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ
দেশের অবৈধ মোবাইল বাজার নিয়ন্ত্রণকারী যে ২২ জনের সিন্ডিকেটের কথা বলা হচ্ছে, তাদের অনেকেরই প্রধান সাপ্লাই চেইন বা গোডাউন চট্টগ্রামে অবস্থিত। এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেটটি নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে এবং সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে ‘দোকান বন্ধ হয়ে যাবে’ এমন আতঙ্ক ছড়িয়ে আন্দোলন উসকে দিচ্ছে।
৪. রিফারবিশড ও নকল ফোনের স্বর্গরাজ্য
রিয়াজউদ্দিন বাজারে পুরোনো ফোন মেরামত করে বা বডি পরিবর্তন করে নতুন (রিফারবিশড) হিসেবে চালানোর বিশাল এক ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে। এনইআইআর-এর ডাটাবেজে এই ফোনগুলোর সঠিক তথ্য না থাকায় সেগুলো ব্লক হয়ে যাবে। ফলে নকল ও নিম্নমানের ফোনের ব্যবসা করে যারা কোটিপতি হয়েছেন, তাদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

৫. সরকারকে ব্ল্যাকমেইল করার কৌশল
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা মনে করেন, তারা যদি মার্কেট বন্ধ রেখে ধর্মঘট করেন, তবে সরকার চাপে পড়বে। কারণ চট্টগ্রামের বন্দর ও পাইকারি বাজারগুলো দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা এই গুরুত্বকে পুঁজি করে এনইআইআর বাস্তবায়ন পিছিয়ে দিতে চায় যাতে তাদের অবৈধ স্টকগুলো কোনোমতে বিক্রি করে দেওয়া যায়।
৬. হুন্ডি ও কালো টাকার বিশাল বিনিয়োগ
অবৈধ ফোনের এই ৯৬ হাজার কোটি টাকার ব্যবসার পেছনে চট্টগ্রামের হুন্ডি সিন্ডিকেটের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। যেহেতু এই ব্যবসায় কোনো এলসি (LC) খোলা হয় না, তাই পুরো লেনদেন হয় কালো টাকায়। এনইআইআর চালু হলে এই সমান্তরাল অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে, যা এই প্রভাবশালী চক্রটি কোনোভাবেই চায় না।
৭. ‘সাঁড়াশি অভিযান’ ও আইনি ভীতি
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা জানেন যে এনইআইআর পুরোপুরি কার্যকর হওয়া মানেই হলো বিটিআরসি ও শুল্ক গোয়েন্দাদের নিয়মিত অভিযান। রিয়াজউদ্দিন বাজারের সরু গলিগুলোতে যে কয়েক হাজার কোটি টাকার অবৈধ স্টকের পাহাড় রয়েছে, তা তখন গোপন রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের এই বিরোধিতার মূলে সাধারণ ব্যবসায়ীদের স্বার্থ নয়, বরং ৯৬ হাজার কোটি টাকার চোরাচালান সিন্ডিকেটকে রক্ষা করা। তাদের দাবিগুলো মূলত অবৈধ পণ্যকে বৈধ করার একটি অপচেষ্টা মাত্র। এনইআইআর কার্যকর হলে চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজার কেন্দ্রিক এই ‘ডার্ক ওয়েব’ পুরোপুরি ভেঙে পড়বে, যা দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য।





















