বাংলাদেশে ডিজিটাল জালিয়াতি ও মোবাইল চুরির নেপথ্যে কাজ করছে এক ভয়ংকর প্রযুক্তিগত কারচুপি। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিটিআরসি-র সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে সচল লাখ লাখ হ্যান্ডসেট আসলে ‘ফেক’ বা ‘ডুপ্লিকেট’ আইএমইআই (IMEI) নম্বর ব্যবহার করছে। এই অনিবন্ধিত ও ক্লোন ডিভাইসের কারণেই দেশে ডিজিটাল অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
বিটিআরসির ডাটাবেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ১০ বছরে মাত্র একটি আইএমইআই নম্বর—৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯ ব্যবহার করে দেশে ৩ কোটি ৯১ লাখ ২২ হাজার ৫৩৪টি মোবাইল ফোন সচল করা হয়েছে। এছাড়া আরও কিছু শীর্ষ ডুপ্লিকেট আইএমইআই নম্বরের চিত্র নিম্নরূপ:
৪৪০০১৫২০২০০০: এই নম্বরে সচল আছে সাড়ে ১৯ লাখ ডিভাইস। ৩৫২২৭৩০১৭৩৮৬৩৪: এই নম্বরে সচল সাড়ে ১৭ লাখ ডিভাইস। ৩৫২৭৫১০১৯৫২৩২৬: সোয়া ১৫ লাখ ডিভাইস। শুধু ‘০’ (শুন্য): প্রায় ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৩৩১টি ফোনে আইএমইআই হিসেবে শুধু শূন্য ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১ লাখেরও বেশি ফেক আইএমইআই বর্তমানে দেশের নেটওয়ার্কে সচল রয়েছে, যা মূলত চোরাচালানের মাধ্যমে আসা এবং পুনঃপ্রোগ্রাম (Reprogramming) করা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে সংঘটিত ডিজিটাল জালিয়াতির ৭৩ শতাংশই ঘটে অনিবন্ধিত ডিভাইসের মাধ্যমে। আরও উদ্বেগজনক তথ্য দিয়েছে এমএফএস (MFS) প্রতিষ্ঠানগুলো; তাদের মতে, ২০২৩ সালে ই-কেওয়াইসি (e-KYC) জালিয়াতির ৮৫ শতাংশই ঘটেছে অবৈধ অথবা ডুপ্লিকেট আইএমইআই যুক্ত হ্যান্ডসেট ব্যবহার করে। ফলে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অপরাধীকে শনাক্ত করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে ১.৮ লাখ ফোন চুরির রিপোর্ট করা হলেও এর বেশিরভাগই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া রিপোর্ট করা হয়নি এমন চুরির সংখ্যা আরও কয়েক লাখ। চোরাই ফোনগুলো দ্রুত এই ‘ডুপ্লিকেট’ বা ‘ফেক’ আইএমইআই সিন্ডিকেটের কাছে চলে যায়, যারা সফটওয়্যারের মাধ্যমে আইএমইআই পরিবর্তন করে পুনরায় বাজারে ছাড়ে। ফলে ফোন হারানো গ্রাহক আর কখনোই তার প্রিয় ডিভাইসটি ফিরে পান না।
বৈধ পথে আসা মোবাইল যখন ‘গ্রে মার্কেটে’ বা চোরাচালানের মাধ্যমে বিক্রি হয়, তখন তা সরকারি তালিকা বা এনইআইআর (NEIR) ডাটাবেজে ওঠে না। এতে সরকার যেমন প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি ফুলে-ফেঁপে উঠছে সংশ্লিষ্ট অসাধু ব্যবসায়ী ও ২২ জনের সেই শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
বিশ্লেষকদের মতে, চোরাচালানের মাধ্যমে আসা এই হ্যান্ডসেটগুলো দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনে বড় ধরণের নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। অপরাধী চক্র অনায়াসেই পার পেয়ে যাচ্ছে, কারণ তাদের ব্যবহৃত ডিভাইসের কোনো বৈধ পরিচয় রাষ্ট্রীয় নথিতে নেই।
প্রযুক্তিবিদদের মতে, এনইআইআর (NEIR) বা ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার পূর্ণাঙ্গ কার্যকর করাই এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ। আইএমইআই ডাটাবেজ স্বচ্ছ থাকলে একটি আইএমইআই নম্বর কেবল একটি ডিভাইসের জন্যই বরাদ্দ থাকবে এবং চুরি হওয়া বা ক্লোন করা ফোন নেটওয়ার্কে সচল করা সম্ভব হবে না।






















