বাংলাদেশে অবৈধ মোবাইল বাণিজ্যের যে বিশাল সাম্রাজ্য গত কয়েক বছর ধরে গড়ে উঠেছিল, তা এখন পতনের মুখে। বিটিআরসির কঠোর অবস্থান এবং এনইআইআর (NEIR) বাস্তবায়নের অনড় সিদ্ধান্তে হাজার কোটি টাকার সেই ‘ডিজিটাল মাফিয়া’ সিন্ডিকেটের ভেতরে এখন চরম অস্থিরতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে প্রভাবশালী নেতাদের রহস্যজনক নীরবতা ও পদত্যাগের গুঞ্জন এই ফাটলকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এবং এমবিসিবি-এর সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ পিয়াস-এর পদত্যাগের গুঞ্জন পুরো সংগঠনে কম্পন সৃষ্টি করেছে। পিয়াস বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠান ‘ডেক্সিম্পো ইন্টারন্যাশনাল’-কে বৈধ আমদানিকারক হিসেবে টিকিয়ে রাখতে মরিয়া। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংগঠনের এক নেতা বলেন, “আমরা যখন এনইআইআর বন্ধের জন্য রাস্তায় আন্দোলন করছি, তখন পিয়াস ভাই নিজের ‘ওয়ানপ্লাস’ ও ‘অ্যাঙ্কার’-এর ডিস্ট্রিবিউটরশিপ বাঁচাতে সরকারের সাথে তলে তলে আঁতাত করছেন। এটি আমাদের সাথে স্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা।”
সিন্ডিকেটের ভেতরে এখন দুটি পক্ষ তৈরি হয়েছে। এক পক্ষে আছেন ‘লাগেজ সোহেল’ খ্যাত আনিসুর রহমান সোহেলের মতো কট্টরপন্থীরা, যারা এনইআইআর বাতিল না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে চান। অন্যপক্ষে আছেন সেই সব ব্যবসায়ীরা, যাদের কিছু বৈধ এলসি বা ডিস্ট্রিবিউটরশিপ আছে। এই দ্বিতীয় পক্ষটি মনে করছে, অবৈধ ব্যবসায়ীদের সাথে থাকলে তাদের বৈধ ব্যবসাও ঝুঁকির মুখে পড়বে। এই স্বার্থের দ্বন্দ্বে সিন্ডিকেটের চেইন অব কমান্ড এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
আন্দোলনের শুরুতে সারা দেশের মোবাইল মার্কেটগুলো থেকে কয়েক কোটি টাকার বিশাল তহবিল সংগ্রহ করা হয়েছিল। অভিযোগ উঠেছে, এই তহবিলের একটি বড় অংশ প্রভাবশালী কয়েকজন নেতা আত্মসাৎ করেছেন। সাধারণ খুচরা বিক্রেতারা এখন প্রশ্ন তুলছেন—“সরকার ভ্যাট-ট্যাক্স কমানোর পরও আমরা কেন দোকান খুলতে পারব না? আন্দোলনের টাকা কোথায় গেল?” এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারছেন না সিন্ডিকেট নেতারা।
গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির ফলে সিন্ডিকেট সদস্যদের মধ্যে এখন ‘গ্রেপ্তার আতঙ্ক’ কাজ করছে। অনেক সদস্য ভয় পাচ্ছেন যে, নিজেদের বাঁচাতে প্রভাবশালী নেতারা ছোট ব্যবসায়ীদের নাম প্রশাসনের কাছে ফাঁস করে দিতে পারেন। বিশেষ করে চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজার ও সিলেটের করিমউল্লাহ মার্কেটের ব্যবসায়ীদের মধ্যে এই সন্দেহ সবচেয়ে বেশি। অনেক ব্যবসায়ী এখন ব্যক্তিগত যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়ে আড়ালে চলে গেছেন।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের কঠোর বার্তার পর সিন্ডিকেটের অনেক সদস্য এখন ‘ভোলবদল’ করছেন। যারা আগে এনইআইআর-কে ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতা খর্ব’ বলে প্রচার করত, তারা এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘নিবন্ধিত ফোনের গুরুত্ব’ নিয়ে পোস্ট দিচ্ছে। এই ভোলবদল সিন্ডিকেটের ভেতরের সংঘাতকে আরও উসকে দিয়েছে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধী চক্র যখন অস্তিত্ব সংকটে পড়ে, তখন তারা নিজেদের ভেতর থেকেই ধ্বংস হতে শুরু করে। ৯৬ হাজার কোটি টাকার এই অবৈধ ব্যবসার মূল ভিত্তি ছিল গোপনীয়তা এবং রাজনৈতিক প্রশ্রয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ঢাল সরে যাওয়ায় সিন্ডিকেটের ‘ডার্ক ওয়েব’ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে।






















