দেশের হাজার কোটি টাকার অবৈধ মোবাইল বাজারের অন্দরমহলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ তথ্য। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তথাকথিত ‘গ্রে-মাফিয়া’ সিন্ডিকেটের ২০ হাজার কোটি টাকার যে বিশাল সাম্রাজ্য নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তার সিংহভাগই দখল করে আছে ‘রিফারবিশড আইফোন’ (Refurbished iPhone)। মূলত নতুন আইফোনের উচ্চমূল্যকে পুঁজি করে সাধারণ ক্রেতাদের চোখে ধুলো দিচ্ছে এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দুবাই, হংকং এবং আমেরিকা থেকে লট আকারে নষ্ট বা পুরোনো আইফোন সংগ্রহ করে এই সিন্ডিকেট। এরপর সেগুলোকে স্থানীয় ল্যাবে বা বিদেশের গোপন কারখানায় সস্তায় মেরামত করা হয়।
প্রতারণার কৌশল: ফোনের মূল মাদারবোর্ড ঠিক রেখে ডিসপ্লে, ব্যাটারি এবং বডি পরিবর্তন করে চকচকে নতুন রূপ দেওয়া হয়।
প্যাকেজিং কারসাজি: বাজারে নতুনের মতো দেখতে নকল বক্স এবং সিল (Seal) তৈরি করে এগুলোকে ‘আন-অফিশিয়াল’ বা ‘লাগজে পণ্য’ হিসেবে বাজারে ছাড়া হয়।
মূল্য ফাঁদ: অফিসিয়াল আইফোনের দাম যদি ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা হয়, এই রিফারবিশড সেটগুলো মাত্র ১ লাখ ২০ বা ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করে ক্রেতাদের প্রলুব্ধ করা হয়।
বিটিআরসির তথ্যানুযায়ী, এই রিফারবিশড সেটগুলোর একটি বিশাল অংশ সচল আছে ফেক আইএমইআই (IMEI) নম্বরে। বিশেষ করে ৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯ নম্বরে দেশে প্রায় ৪ কোটি ডিভাইস সচল থাকার যে তথ্য মিলেছে, তার একটি বড় অংশই হলো এই রিফারবিশড আইফোন। এনইআইআর (NEIR) সিস্টেম কার্যকর হলে এই ফোনগুলো শনাক্ত হওয়া এবং নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয়েই এখন সিন্ডিকেটটি মরণকামড় দিচ্ছে।
অনেক সময় দেখা যায়, ৭দিনের ওয়ারেন্টি দিয়ে বিক্রি করা এই রিফারবিশড আইফোনগুলো ১-২ মাস পরেই ব্যাটারি ফুলে যাওয়া বা ডিসপ্লেতে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তখন ক্রেতারা অভিযোগ নিয়ে গেলে দোকানদাররা ‘ব্যবহারকারীর ভুল’ বলে দায় এড়িয়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, এসব অনিবন্ধিত আইফোনের মাধ্যমে সংঘটিত ডিজিটাল জালিয়াতির পরিমাণও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
২০ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল লাভজনক বাজার হাতছাড়া হওয়ার ভয়েই ‘লাগেজ সোহেল’ বা ‘পিয়াস’ সিন্ডিকেটের মতো রাঘববোয়ালরা এনইআইআর (NEIR) ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মাঠ গরম করছে। তারা জানে, এনইআইআর পুরোপুরি কার্যকর হওয়া মানেই হলো প্রতিটি আইফোনের উৎস এবং বৈধতা নিশ্চিত হওয়া। এতে তাদের এই ‘রিফারবিশড’ জালিয়াতি চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।
প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, আইফোন কেনার সময় প্রতিটি ক্রেতার উচিত বিটিআরসির পোর্টালে গিয়ে আইএমইআই যাচাই করা। যদি আইএমইআই-এর তথ্য ডাটাবেজে না মেলে, তবে সেটি নিশ্চিতভাবে রিফারবিশড বা চোরাই ফোন। সরকার যদি এই ২০ হাজার কোটি টাকার ‘রিফারবিশড মাফিয়া’ ভাঙতে পারে, তবে দেশের রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি ডিজিটাল নিরাপত্তা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।






















