তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার। মানুষের কণ্ঠস্বর আর মুখভঙ্গি হুবহু নকল করে ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তির মাধ্যমে অপরাধীরা এখন চালাচ্ছে নিখুঁত প্রতারণা। গত তিন বছরে এ ধরনের প্রতারণার হার বেড়েছে ২ হাজার শতাংশেরও বেশি। হংকং থেকে সিঙ্গাপুর—বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো নিমিষেই কোটি কোটি টাকা হারাচ্ছে এই অদৃশ্য শত্রুর হাতে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আপনার ডিজিটাল জীবনকে সুরক্ষিত রাখতে সচেতনতাই এখন প্রধান অস্ত্র।
ডিপফেক কীভাবে আপনার ফাঁদ পাতে?
প্রতারকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (ফেসবুক, ইউটিউব, লিংকডইন) থেকে আপনার ছবি এবং কণ্ঠ সংগ্রহ করে। এরপর এআই অ্যালগরিদমের মাধ্যমে এমন ভিডিও তৈরি করে যা দেখে আপনার পরিবারের সদস্য বা অফিসের সহকর্মীরাও বিভ্রান্ত হতে পারেন। পরিচিত মানুষের কণ্ঠ বা মুখ দেখলে আমাদের স্বাভাবিক সন্দেহ কমে যায়, আর এই মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকেই কাজে লাগায় জালিয়াতরা।
চেনার উপায়: নিখুঁত হলেও যেখানে ধরা খাবে এআই
ডিপফেক ভিডিও যতই উন্নত হোক, গভীর পর্যবেক্ষণে কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়তে পারে:
অস্বাভাবিক চোখ: ভিডিওর ব্যক্তিটি কি খুব ঘনঘন বা খুব কম চোখের পলক ফেলছেন?
ঠোঁটের অমিল: লক্ষ্য করুন কথা বলার সময় ঠোঁটের নড়াচড়া কণ্ঠস্বরের সঙ্গে শতভাগ মিলছে কি না।
ত্বকের গঠন: এআই-এর তৈরি মুখমণ্ডল অনেক সময় অস্বাভাবিক মসৃণ বা ঝাপসা দেখায়।
আচরণের ধরণ: পরিচিত কেউ যদি হঠাৎ অস্বাভাবিক তাড়াহুড়ো দেখায় বা এমন কোনো অনুরোধ করে (যেমন: বড় অংকের টাকা পাঠানো) যা তার স্বভাববিরুদ্ধ, তবেই সতর্ক হোন।
প্রতারণা রুখতে আপনার জন্য ৫টি টিপস
১. ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশে লাগাম: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় ছবি বা কণ্ঠের ভিডিও শেয়ার করা কমিয়ে দিন। প্রোফাইল ‘লক’ রাখা এবং পাবলিক পোস্টে সতর্কতা জরুরি।
২. দুই স্তরের নিরাপত্তা (2FA): শুধু পাসওয়ার্ডে ভরসা না করে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু করুন। সম্ভব হলে ‘ফিশিং-রেজিস্ট্যান্ট’ এমএফএ ব্যবহার করুন।
৩. ভিন্ন মাধ্যমে যাচাই (Cross-Verify): ভিডিও কলে কোনো আর্থিক অনুরোধ পেলে সাথে সাথে কাজ শুরু করবেন না। কলটি কেটে দিয়ে অন্য কোনো মাধ্যমে (যেমন সরাসরি ফোন কল বা মেসেজ) সেই ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করুন।
৪. ব্যক্তিগত ‘কোডওয়ার্ড’ ব্যবহার: পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যদের মধ্যে একটি গোপন কোড বা পাসওয়ার্ড ঠিক করে রাখতে পারেন। জরুরি পরিস্থিতিতে পরিচয় নিশ্চিত করতে এই কোডটি কাজে দেবে।
৫. অ্যাপ ও সফটওয়্যার আপডেট: আপনার ডিভাইসগুলোকে সর্বদা আপডেট রাখুন। আধুনিক অ্যান্টি-ভাইরাস এবং এআই-বেজড সিকিউরিটি সিস্টেম এখন ডিপফেক শনাক্ত করতে অনেক কার্যকর।
প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সতর্কতা
বড় অংকের লেনদেনের ক্ষেত্রে ‘কলব্যাক পলিসি’ এবং একাধিক স্তরের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা উচিত। কর্মকর্তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন ধরণের এআই স্ক্যাম সম্পর্কে সচেতন রাখতে হবে।
পরিশেষ: ২০২৬ সালে এসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আর কেবল পাসওয়ার্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এআই যেমন আমাদের কাজ সহজ করছে, তেমনি এটি অপরাধীদের হাতকেও শক্তিশালী করেছে। তাই মনে রাখবেন— “যা দেখছেন বা শুনছেন, তা-ই সবসময় সত্যি নয়।”






















