ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধ পঞ্চম সপ্তাহে গড়িয়েছে। এ পুরো সময়ের মধ্যে গতকাল শুক্রবার ছিল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে কঠিন দিন। ইরানি সশস্ত্র বাহিনী দাবি করেছে, শুক্রবার তাদের বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী অন্তত দুটি যুদ্ধবিমান এবং পাঁচটি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। এছাড়া দুটি সামরিক হেলিকপ্টারে আঘাত হেনেছে।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) শনিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের সমন্বিত বিমান প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের নতুন ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব লক্ষ্যবস্তু প্রতিহত করা হয়েছে।
ইরান শুক্রবার যে দুটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে, তার মধ্যে একটি এফ-১৫ই ও অন্যটি এ-১০ ওয়ারথগ যুদ্ধবিমান। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) শুরুতে ক্ষয়ক্ষতি অস্বীকার করে সব বিমান অক্ষত থাকার দাবি করলেও পরবর্তীতে ঘটনার ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করে ইরান। এরপরই মার্কিন ও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলো নিশ্চিত করে, দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘এফ-১৫ই’ মডেলের যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। বিমানটিতে থাকা দুজন ক্রুর মধ্যে পাইলটকে উদ্ধার করা গেলেও কো-পাইলট এখনো নিখোঁজ রয়েছে। তাকে খুঁজতে এরই মধ্যে অভিযান চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। যুদ্ধের মধ্যেই এ যেন আরেক যুদ্ধ।
ইরানি সামরিক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় কোহগিলুয়েহ ও বোয়ের-আহমাদ প্রদেশে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। আইআরজিসি এলাকাটি ঘিরে রেখেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো তারাও নিখোঁজ কো-পাইলটের সন্ধানে তল্লাশি চালাচ্ছে।
এদিকে নিখোঁজ কো-পাইলটকে উদ্ধারে অভিযানে চালাতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছে মার্কিন বাহিনী। অভিযানে অংশ নেয়া দুটি ‘ব্ল্যাক হক’ হেলিকপ্টার লক্ষ্য করে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে গুলি চালানো হয়। তবে হেলিকপ্টারগুলো বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই অভিযান চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে বার্তা সংস্থা বিবিসি জানিয়েছে, ভূপাতিত মার্কিন যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ ক্রু সদস্যের জন্য চলমান উদ্ধার অভিযানটি অত্যন্ত জরুরি এবং একই সঙ্গে সময়-সংবেদনশীল। কারণ মার্কিন ‘কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ’ দলের পাশাপাশি ইরানও একই ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এমনকি তার সন্ধান দিতে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছে।
সামরিক কৌশলবিদ এবং শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কূটনীতিক জেমস জেফ্রির মতে, এ ধরনের উদ্ধার অভিযানকে সবচেয়ে বিপজ্জনক সামরিক অভিযান বলে মনে করা হয়। এ অভিযানগুলো সাধারণত হেলিকপ্টারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যেখানে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান এবং হামলা ও পাহারার জন্য অন্য সামরিক বিমান সহায়তায় থাকে। শুক্রবার ইরান থেকে পাওয়া একটি যাচাইকৃত ভিডিওতে খুজেস্তান প্রদেশের ওপর এ ধরনের একটি মিশন চলতে দেখা গেছে।
জেফ্রি বলেন, এ অভিযানে যারা অংশ নিয়েছেন, তারা মার্কিন বিমান বাহিনীর বিশেষ অপারেশন সদস্য। তারা ডেল্টা ফোর্স বা নেভি সিল টিম সিক্স-এর পর্যায়ের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, পাশাপাশি চিকিৎসা প্রদানের সক্ষমতাও রয়েছে। তারা যদি মনে করে, কো-পাইলটকে উদ্ধারের সামান্যতম সম্ভাবনাও আছে, তবে তাকে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত তারা হাল ছাড়বে না।
তিনি আরো জানান, শত্রুপক্ষের এলাকায় কোনো যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হলে সেটির পাইলট ও ক্রু সদস্যদেরও এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেয়া থাকে।
থিংক ট্যাঙ্ক ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের সিনিয়র ফেলো এবং সামরিক বিশ্লেষণ পরিচালক জেনিফার কাভানাঘ বিবিসিকে বলেছেন, নিখোঁজ মার্কিন বৈমানিকের এক নম্বর অগ্রাধিকার হলো বেঁচে থাকা এবং বন্দি এড়ানো। তাই তাদের এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় যেন—শারীরিকভাবে সক্ষম থাকলে এবং গুরুতর আহত না হলে দ্রুত ইজেকশন সাইট (যেখানে বিমান থেকে অবতরণ করেছে) থেকে দূরে নিরাপদ স্থানে সরে যায় এবং আত্মগোপন করে।
ইরানে নিখোঁজ মার্কিন যুদ্ধবিমানের ক্রু সদস্যকে খুঁজে পেতে বিশেষজ্ঞ যুদ্ধকালীন অনুসন্ধান ও উদ্ধার ইউনিটগুলো ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টার ব্যবহার করে এলাকা চষে বেড়াবে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র বিমানবাহিনীর প্যারারেস্কিউ জাম্পারদের এক সাবেক কমান্ডার।
বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএস নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ওই সাবেক কমান্ডার বলেন, যদি উদ্ধার অভিযান এমন এলাকায় থাকে যেখানে হেলিকপ্টার পৌঁছাতে পারে না, সেক্ষেত্রে এসি-১৩০ গানশিপ থেকে স্কোয়াডের সদস্যরা নেমে স্থলপথে উদ্ধার অভিযান চালাবেন।
তিনি আরো বলেন, মাটিতে নামার পর প্যারারেস্কিউ জাম্পারদের লক্ষ্য থাকে নিখোঁজ ক্রু সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা। একইসঙ্গে প্রয়োজন হলে চিকিৎসা সহায়তা দেয়া, শত্রুকে এড়িয়ে যাওয়া বা প্রতিরোধ করা এবং এমন একটি স্থানে পৌঁছানো যেখান থেকে তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
এই প্যারারেস্কিউ সদস্যদের বিমানবাহিনীর ‘সুইস আর্মি নাইফ’ বলা হয়। তাদের কাজকে ‘ভয়াবহ এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক’ বলা হলেও কম বলা হবে বলে জানান তিনি।



















