কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কি সত্যিই মানুষের সৌন্দর্যের সঠিক বিচারক হতে পারে? নতুন এক গবেষণা বলছে, এর উত্তরটি সাধারণ মানুষের ধারণার তুলনায় ঢের বেশি জটিল।
নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে, এআই সৌন্দর্যের কোনো সর্বজনীন মানদণ্ড নয়, বরং মানুষের দেওয়া তথ্যের ভেতরে থাকা পক্ষপাতিত্বই প্রকাশ করে।
দীর্ঘদিনের প্রচলিত ‘গোল্ডেন রেশিও’ বা গাণিতিক অনুপাতকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে গবেষকরা দাবি করেছেন, এআইয়ের রূপের বিচার আসলে নিরপেক্ষ নয়, বরং এখানে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
‘ইউনিভার্সিটি অফ ভার্জিনিয়া স্কুল অফ ডেটা সায়েন্স’-এর গবেষকরা বলছেন, এআই দিয়ে মানুষের সৌন্দর্য মাপার চেষ্টা আসলে সৌন্দর্যের কোনো চিরন্তন নিয়মকে তুলে ধরে না, বরং এর মাধ্যমে ডেটা বা তথ্যের ভেতরে লুকিয়ে থাকা মানুষের নানা পক্ষপাতিত্বই ফুটে ওঠে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সাইট নোরিজ প্রতিবদেন লিখেছে, বহু বছর ধরে অনেক মানুষের মনে এক বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে, ‘গোল্ডেন রেশিও’ বা বিশেষ এ গাণিতিক সূত্রের মাধ্যমেই সৌন্দর্যের রহস্য ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এ সূত্রটি প্রকৃতি ও শিল্পকলার অনেক জায়গায় খুঁজে পাওয়া যায়।
অনেক ক্ষেত্রেই এ সূত্র দিয়ে দাবি করা হত মুখের বিশেষ এক ধরনের অনুপাত বা গঠনই অন্যগুলোর চেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। বর্তমানের এ গবেষণায় বিজ্ঞানীরা খতিয়ে দেখেছেন, আধুনিক এআই প্রযুক্তির বিশ্লেষণে এ ধারণাটি আদৌ ধোপে টেকে কি না।
গবেষক দলটি অনেক মানুষের মুখের ছবি নিখুঁতভাবে পরীক্ষার জন্য আধুনিক ‘কম্পিউটার ভিশন’ ও পরিসংখ্যানগত পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন।
গবেষকরা মানুষের আসল চেহারার সঙ্গে ‘গোল্ডেন রেশিও’ বা গাণিতিক অনুপাতের তুলনার করার পাশাপাশি এআই সৌন্দর্যকে কীভাবে মূল্যায়ন করে, তার ধরন বা প্যাটার্ন খোঁজার জন্য ‘রিগ্রেশন অ্যানালাইসিস’ ও ‘ক্লাস্টারিং’-এর মতো উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি প্রয়োগ করেছেন।
এ পরীক্ষার ফলাফল ছিল একেবারে স্পষ্ট। সৌন্দর্যের কোনো সর্বজনীন বা চিরন্তন নিয়মের বদলে গবেষকরা বলছেন, বিভিন্ন জাতিগত বা জনতাত্ত্বিক পার্থক্যের প্রভাবই এখানে বেশি।
সহজ কথায় বলতে গেলে, কোনো গাণিতিক আদর্শের চেয়ে বরং যে ধরনের মানুষের ছবি দিয়ে এআই’কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে সেসব মুখের গঠনই এআইয়ের বিচারবুদ্ধির ওপর প্রভাব ফেলেছে।
যার মানে, এআই কোনো চেহারাকে যখন ‘সুন্দর’ হিসেবে শনাক্ত করে তখন তা নির্ভর করে সে কোন ধরনের ডেটা বা তথ্য থেকে শিক্ষা নিয়েছে তার ওপর। যদি তথ্যভাণ্ডারে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর আধিক্য থাকে বা কোনো গোষ্ঠী অবহেলিত হয় তবে এআইয়ের ফলাফলেও সেই ভারসাম্যহীনতার প্রতিফলন ঘটে।
গবেষণার এসব ফলাফল থেকে ইঙ্গিত মেলে, সৌন্দর্যের যেসব ধারণাকে আমরা সর্বজনস্বীকৃত বা বস্তুনিষ্ঠ বলে মনে করি সেগুলো আসলে তেমন নয়, বরং এসব ধারণা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রভাবের মাধ্যমে গড়ে ওঠে।
বিভিন্ন এআই সিস্টেমকে আমরা প্রায়ই নিরপেক্ষ বা পক্ষপাতহীন বলে মনে করি। গবেষকরা বলছেন, এআইয়ের গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাকে সবার সামনে তুলে ধরেছেে এ গবেষণা।
তবে বাস্তবে এআইগুলো সরাসরি মানুষের তৈরি তথ্য বা ডেটা থেকেই শেখে। ফলে, যদি সেই তথ্যে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব থাকে তবে এআই সেই একই পক্ষপাতের পুনরাবৃত্তি করে, ক্ষেত্রবিশেষে তা আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রযুক্তিতে এখন এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে গবেষণাটি এখন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, সামাজিক মিডিয়া ফিল্টার, চেহারা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা ও মানুষের বাহ্যিক রূপ বিশ্লেষণ করে এমন অন্যান্য প্রযুক্তি অজান্তেই সৌন্দর্যের কোনো এক সংকীর্ণ বা বৈষম্যমূলক মানদণ্ডকে উৎসাহিত করতে পারে।
এসব সিস্টেম যখন ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় তখন এগুলো মানুষ নিজের সম্পর্কে বা অন্যদের সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করবে, তার ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
এ গবেষণার শেষ অংশটি মনে করিয়ে দিয়েছে, সৌন্দর্য আসলে জটিল ও একান্তই ব্যক্তিগত অনুভূতি। গণিত হয়ত প্রকৃতির বিভিন্ন ধরন বা প্যাটার্ন ব্যাখ্যা করতে পারে তবে মানুষের ভালো লাগা বা সৌন্দর্যের ধারণা গড়ে ওঠে তার সংস্কৃতি, বেড়ে ওঠা ও নিজস্ব রুচির মাধ্যমে। একজনের কাছে যা সুন্দর, অন্য কারোর কাছে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।



















