দেশে মোবাইল ফোন উৎপাদনকারীরা নিয়ম মেনে ভ্যাট ও কর দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বাজারে টিকে থাকা তাদের জন্য দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। কারণ, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অবৈধ পথে আসা মোবাইল ফোন এখন দেশের বাজারের একটি বড় অংশ দখল করে ফেলেছে। ব্যবসা করছে তারা বুক ফুলিয়ে—কোনো লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন বা ভ্যাট ছাড়াই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের নীতির ভুল ও দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাই দেশের বৈধ মোবাইল উৎপাদন খাতকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
দেশের মোবাইল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কর প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা ভ্যাট ও কাস্টমস ডিউটি পরিশোধ করতে হয়। শুধু উৎপাদন পর্যায়েই ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ১০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত বিভিন্ন শুল্ক দিতে হয়।
অন্যদিকে অবৈধভাবে আমদানি হওয়া মোবাইল ফোনগুলো কোনো শুল্ক ছাড়াই আসছে বাজারে। ফলে একজন বৈধ কোম্পানির তৈরি ফোন যেখানে বিক্রি হয় ১৫-২০ হাজার টাকায়, সেখানে একই মানের অবৈধ ফোন পাওয়া যাচ্ছে ১২-১৪ হাজার টাকায়।
“আমরা ভ্যাট দিয়ে প্রতিযোগিতায় নামি, আর তারা কর ফাঁকি দিয়ে বাজার দখল করে। এটা কি ন্যায্য?”
– বলেছেন এক বৈধ মোবাইল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।
চোরাই ফোনের রমরমা বাজার
বিটিআরসির তথ্যমতে, প্রতি মাসে বাংলাদেশে প্রায় ২–৩ লাখ অবৈধ মোবাইল হ্যান্ডসেট ঢোকে। বিমানবন্দর, বন্দর ও সীমান্ত দিয়ে ব্যক্তিগত লাগেজ বা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এসব ফোন আসছে।
এমনকি রাজধানীর মোবাইল বাজারগুলোতেও অবলীলায় বিক্রি হচ্ছে আনরেজিস্টার্ড চাইনিজ বা রিফারবিশড ফোন। অথচ এসব ফোনের বিপরীতে কোনো ভ্যাট বা আয়কর আদায় হচ্ছে না।
বাজার হারাচ্ছে দেশীয় শিল্প
ভ্যাটসহ বৈধভাবে তৈরি হওয়া ফোনগুলো তুলনামূলক দামি হওয়ায় ক্রেতাদের বড় একটা অংশ চলে যাচ্ছে চোরাই ফোনের দিকে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সিম্ফনি, ওয়ালটন, অপো, রিয়েলমি, ফাইভস্টারসহ দেশীয় উৎপাদনকারীরা।
“আমরা উৎপাদনে টাকা খরচ করে, শ্রমিক দিয়ে ফোন বানাই, অথচ দেখছি ভ্যাট না দিয়েই এক শ্রেণির ব্যবসায়ী দোকানে দোকানে ফোন বিক্রি করছে”, বলেন ওয়ালটনের একজন কর্মকর্তা।
আয়ের ক্ষতি সরকারেরও
অবৈধ ফোন ব্যবসায়ীরা শুধু দেশের বৈধ ব্যবসা নয়, সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাও ফাঁকি দিচ্ছে। কাস্টমস ও এনবিআরের তথ্যমতে, চোরাই ফোনের কারণে বছরে প্রায় ৫০০–৭০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এনবিআর ও বিটিআরসির সমন্বয়হীনতা, কাস্টমস গোয়েন্দা নজরদারির দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবই অবৈধ ব্যবসা বন্ধে বড় বাধা। টেলিকম বিশ্লেষক রেজাউল করিম বলেন, “বাজারে ফোন আসার আগেই IMEI যাচাই নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে VAT রেজিস্ট্রেশন ছাড়া যেন কোনো ফোন বিক্রি না হয়, সেটা মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে।”
দেশে আইন মেনে ব্যবসা করলে ভ্যাট দিতে হয়, লাইসেন্স নিতে হয়, প্রডাকশন সেটআপ করতে হয়। অথচ সবকিছু এড়িয়ে অবৈধভাবে ফোন এনে ব্যবসা করা যাচ্ছে অনায়াসে—এটাই এখন মোবাইল শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় অবিচার।
উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে বর্তমানে ১৭টি মোবাইল ফোন হ্যান্ডসেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কারখানা রয়েছে। দেশে বছরে চার কোটি হ্যান্ডসেটের চাহিদা রয়েছে, যার মধ্যে আড়াই কোটি হ্যান্ডসেট দেশে উৎপাদিত হচ্ছে। বাকি প্রায় দেড় কোটি হ্যান্ডসেট আমদানির মাধ্যমে চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। দেশের মোবাইল হ্যান্ডসেটের বাজার প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। আমদানি করা হ্যান্ডসেট থেকে সরকার সঠিকভাবে রাজস্ব আদায় করতে পারছে না। রাজস্ব আদায় নিশ্চিত, এই খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ ও জাতীয় নিরাপত্তা অক্ষুণœ রাখার স্বার্থে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) সিস্টেম চালু করা প্রয়োজন। তারা বলছেন, দেশে মোবাইল ফোন অপারেটরের নেটওয়ার্কে সচল রয়েছে ১৯ লাখ ৭৬ হাজার আইফোন, যার মধ্যে ১৯ লাখ ৫৫ হাজারই অবৈধ।
বর্তমানে অবৈধভাবে আমদানি করা মোবাইল হ্যান্ডসেট বিক্রির বিষয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকায় সরকার প্রতিবছর প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।
‘দেশের চাহিদার ৯৯ শতাংশই উৎপাদনের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও মোবাইল ফোনের বাজারের বিশাল অংশ আজ অবৈধভাবে আমদানি করা ফোনের দখলে। এসব ফোনের মধ্যে অনেকগুলো আবার নকল ফোন। যে কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন ভোক্তারা। এসব ফোনের অনেকগুলোতেই আবার নকল আইএমই ব্যবহার করা হয়। যা অপরাধীরা ব্যবহার করায় এসব মোবাইল ফোন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।’






















