কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিকাশের ফলে বিশ্বজুড়ে চাকরি হারানোর যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে এবার মুখ খুলেছেন এআইয়ের অন্যতম পথিকৃৎ এবং ‘এআই গডফাদার’ হিসেবে পরিচিত জিওফ্রে হিন্টন (Geoffrey Hinton)। ২০২৫ সালের ২০শে জুন, শুক্রবার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এআইয়ের কারণে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন।
জিজ্ঞাসাবাদে হিন্টন স্বীকার করেছেন যে এআইয়ের এই অগ্রগতি কিছু নির্দিষ্ট ধরনের চাকরির জন্য হুমকিস্বরূপ। তার মতে, এআই এমন অনেক কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে সক্ষম হচ্ছে, যা এতদিন মানুষের দ্বারা সম্পাদিত হতো। বিশেষ করে পুনরাবৃত্তিমূলক এবং ডেটা-ভিত্তিক কাজগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
এআইয়ের যুগে চাকরি বাঁচাতে হিন্টনের পরামর্শ:
তবে, হতাশাগ্রস্ত না হয়ে জিওফ্রে হিন্টন কর্মজীবীদের এআইয়ের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার এবং নিজেদের দক্ষতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তার মূল পরামর্শগুলো হলো:
১. নতুন দক্ষতা অর্জন করুন (Reskilling and Upskilling): হিন্টন জোর দিয়ে বলেছেন যে, এআইয়ের কারণে যেসব চাকরি বিলুপ্ত হবে, তার বদলে নতুন ধরনের কাজের সুযোগ তৈরি হবে। তাই, কর্মজীবীদের উচিত এআই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে এমন নতুন দক্ষতা অর্জন করা, যা এআই দ্বারা সহজে প্রতিস্থাপন করা যাবে না। বিশেষ করে, সৃজনশীলতা, জটিল সমস্যা সমাধান, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং আবেগিক বুদ্ধিমত্তা (Emotional Intelligence) সম্পন্ন কাজগুলোর চাহিদা বাড়বে।
২. এআই টুলস ব্যবহারে পারদর্শী হোন: এআই প্রযুক্তিকে শত্রু না ভেবে এটিকে একটি সহায়ক টুল হিসেবে দেখা উচিত। হিন্টন পরামর্শ দিয়েছেন যে, কর্মজীবীদের উচিত তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে এআই টুলস ব্যবহার করতে শেখা। যারা এআইয়ের সাথে কাজ করতে পারবেন, তারাই ভবিষ্যতে টিকে থাকবেন। এআইয়ের মাধ্যমে কাজকে আরও দ্রুত এবং কার্যকরভাবে সম্পন্ন করার ক্ষমতা ভবিষ্যতে অত্যন্ত মূল্যবান হবে।
৩. সৃজনশীল এবং মানবিক দক্ষতা বাড়ান: এআই যতই উন্নত হোক না কেন, মানুষের সহজাত সৃজনশীলতা, সহানুভূতি এবং মানবিক মিথস্ক্রিয়াকে এটি পুরোপুরি অনুকরণ করতে পারবে না। তাই, এমনসব দক্ষতা যা মানবিক স্পর্শ দাবি করে, যেমন শিল্পকলা, ডিজাইন, পরামর্শ, শিক্ষকতা, স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি ক্ষেত্রে নিজেদের দক্ষ করে তোলা উচিত।
৪. পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত থাকুন: প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে, এবং এআই এই পরিবর্তনের গতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। হিন্টন বলেন, কর্মজীবীদের মানসিক ও পেশাগতভাবে এই দ্রুত পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। শেখার আগ্রহ বজায় রাখা এবং নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকা সাফল্যের চাবিকাঠি।
ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান নিয়ে হিন্টনের ভাবনা:
জিওফ্রে হিন্টন মনে করেন, এআইয়ের কারণে যে কর্মসংস্থান সংকট দেখা দিতে পারে, তা মোকাবিলায় সরকার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নতুন দক্ষতা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, সামাজিক সুরক্ষা জাল তৈরি করা এবং এআই-এর নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য নীতি প্রণয়ন করা জরুরি।
তিনি সতর্ক করেছেন যে, যদি এই পরিবর্তনগুলো সঠিকভাবে পরিচালিত না হয়, তাহলে সমাজে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভেদ তৈরি হতে পারে। তবে, সঠিকভাবে পরিকল্পনা করা গেলে এআই মানবজাতির জন্য অভূতপূর্ব সুযোগও তৈরি করতে পারে।






















