চলতি বছরের মার্চে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে ডার্ক ওয়েব ব্যবহারকারীর সংখ্যা। মাসের শুরুতে যেখানে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ মানুষ ইন্টারনেটের এ গোপন অংশে প্রবেশ করতেন, মাস শেষে সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ লাখেরও বেশি। টর ম্যাট্রিক্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ডার্ক ওয়েব ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের এমন এক অংশ, যা সাধারণ সার্চ ইঞ্জিন দিয়ে খুঁজে পাওয়া যায় না। এটি একটি এনক্রিপ্টেড নেটওয়ার্ক। যেখানে প্রবেশ করতে হলে বিশেষ ধরনের সফটওয়্যার, সেটিংস ও অনুমতির প্রয়োজন হয়।
এ গোপন ওয়েব ব্যবহারের জন্য সবচেয়ে প্রচলিত প্রযুক্তি হলো ‘টর নেটওয়ার্ক’। ডার্ক ওয়েব অনেক সময় গোপনীয়তা রক্ষার জন্য ব্যবহার হলেও এটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য বেশি কুখ্যাত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গোপনীয়তা রক্ষা, নজরদারির ভয় ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ডার্ক ওয়েবের ব্যবহারকারী বাড়ার মূল কারণ হতে পারে।
প্রতিদিন অসংখ্য সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নিজের ই-মেইল, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা ব্যক্তিগত তথ্য ভাণ্ডারে প্রবেশ করেন। এগুলো পাসওয়ার্ড ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকায় সার্চ ইঞ্জিনে পাওয়া যায় না। এসব সাইট ডিপ ওয়েবের অন্তর্ভুক্ত।
গবেষণায় জানা গেছে, ইন্টারনেটের প্রায় ৯০ শতাংশ ওয়েবসাইটই ডিপ ওয়েবের অংশ। এগুলো ব্যবহার হয় করপোরেশন, সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এ ডিপ ওয়েবের মধ্যেই একটি ছোট অংশ হলো ডার্ক ওয়েব, যেটি টর ব্রাউজারের মতো বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রবেশযোগ্য। যদিও টর ব্যবহার আইনগতভাবে বৈধ, কিন্তু সাধারণ ব্যবহারকারীদের এর প্রয়োজন খুব একটা পড়ে না।
যুক্তরাষ্ট্রের তুলান বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট বলছে, যেসব দেশে সরকার রাজনৈতিক ভিন্নমত দমন করে বা নজরদারির মাধ্যমে নাগরিকদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, সেখানে ডার্ক ওয়েব হলো এক ধরনের মুক্ত যোগাযোগমাধ্যম।
তবে ডার্ক ওয়েব এমন একটি জায়গা, যেখানে ব্যবহারকারীরা নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে পারে। এ গোপনীয়তার সুবিধা নিয়ে অনেকেই বেআইনি ও বিপজ্জনক কাজ করে। তুলান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানে অবৈধ মাদক, অস্ত্র, চুরি হওয়া পাসওয়ার্ড ও পরিচয়পত্র কেনাবেচা হয়। এমনকি অবৈধ ও বিপজ্জনক কনটেন্টও ডার্ক ওয়েবে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিভিন্ন দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ডার্ক ওয়েবের এমন কিছু সাইট শনাক্ত করে বন্ধ করে দিয়েছে। যেমন সিল্করোড, আলফাবে ও হানসা।
এছাড়া এ গোপন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সাইবার হামলা ও তথ্য চুরির মতো ঘটনা বেড়েছে। কারণ সাইবার হামলাকারী থেকে শুরু করে হ্যাকারদের বিচরণই এখানে বেশি। সাধারণ ব্যক্তি থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানসহ বিখ্যাতদের তথ্য এখানে লেনদেন হয়। ফলে এটি এখন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
ক্যাসপারস্কির সাইবার নিরাপত্তাসেবা ক্যাসপারস্কি ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ইন্টেলিজেন্সের তথ্যানুযায়ী, গত দুই বছরে ডার্ক ওয়েবে ২০ লাখের বেশি ব্যাংক কার্ডের তথ্য ফাঁস হয়েছে। ২০২৩-২৪ সালের মধ্যে তথ্য চুরি করা ম্যালওয়্যার থেকে পাওয়া লগ ফাইল বিশ্লেষণ করেই এ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
নিরাপত্তা গবেষক রুনা স্যান্ডভিক বলেন, ‘কে কীভাবে একটি প্রযুক্তি বা সিস্টেম ব্যবহার করছে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে অনেকেই সেটা ব্যবহারের আগ্রহ হারাবে। কারণ মানুষ গোপনীয়তা ও স্বাধীনতা চায়। কিন্তু যদি সিস্টেমে কাউকে শনাক্ত বা নিয়ন্ত্রণ করার কোনো উপায়ই না থাকে, তাহলে খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু মানুষ সে সুযোগের অপব্যবহার করবে।’






















