ডিজিটাইজেশনের নামে বিভিন্ন কৌশলগত অবকাঠামোকে কিছু নির্দিষ্ট দেশি-বিদেশি কোম্পানির কাছে জিম্মি করে রেখে গেছে বিগত সরকার। নানা আইনি বাধা-বিপত্তিতে এখন এসব থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ সহজ নয় বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।
একইসঙ্গে দেশের ডিজিটাল রূপান্তরের ভবিষ্যত কিছু কোম্পানির কাছে বন্ধক রাখার গড্ডালিকা প্রবাহ এবং অদূরদর্শিতার ভয়ংকরতম রোগ থেকে সম্মিলিতভাবে সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন এই প্রকৌশলী।
এজন্য মন্ত্রণালয়, দফতর সংস্থা, সরকারি কোম্পানি কিংবা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার কেনার ক্ষেত্রে এর পুরো সত্ত্ব নিজেদের কাছে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।
তার ভাষায়, জনগণের কর ও ভ্যাটের টাকায় কিংবা বিদেশি ঋণের টাকায় কেনা অটোমেটেড সিস্টেমগুলি কথিত ভেন্ডর লকড, সফটওয়্যার লকড এবং হার্ডওয়্যার লকড থাকা উচিত না।
ইতিমধ্যেই দেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সিস্টেম এবং সফটওয়্যার অটোমেশনের নামে
এমন ক্লোজ সিস্টেমের পেছনে বিনিয়োগ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এসব সিস্টেমগুলো ২০২৮-৩০-৩৪ সাল পর্যন্ত ভেন্ডরের ওপর নির্ভরশীল।
ফয়েজ জানান, এসব সিস্টেমের লাইসেন্স রিনিউয়াল ফি আকাশচুম্বী। ছোট্ট কোন কোড চেঞ্জ কিংবা প্রোফাইল পরিবর্তনের জন্য, কনফিগারেশন মডিফিকেশন এর জন্য হাজার হাজার ডলার খরচ হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতেনিজের ভেরিফায়েড সোশ্যাল হ্যান্ডেলে ৮ আগস্ট রাতে হতবিহ্বল ভাষায় তিনি লিখেছেন, ‘এমন সফটওয়্যার কেনা উচিত না যার সোর্স কোড সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ওউন করে না।’
তিনি মনে করেন, ‘যে প্রতিষ্ঠান গিট হাব ক্রিয়েট কিংবা মেইন্টেইন করতে পারবে না, সে নিজে অটোমেশনের নামে কোন সফটওয়্যার কিনবে না। সিস্টার এন্টারপ্রাইজ বা মন্ত্রণালয়ের যাদের এই যোগ্যতা আছে তাদের দিয়ে সিস্টেমস এবং সফটওয়্যার সার্ভিস কিনতে হবে।’
‘১৮ কোটি মানুষের দেশ, প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন সমস্যা তৈরি হয়। সিস্টেমের আর্কিটেকচার ডিজাইনের সময় বহু ইনপুট ভুল হয় যা শুধরানো লাগে। শুরু থেকেই ডিজাইনে API ইন্টিগ্রেশন এবং ইন্টার-অপারেবিলিটির কথা মনে থাকে না। থাকে না সিকিউরিটির কথা, রিডান্ডেন্সির কথা। এজন্য সফটওয়্যার গুলিতে ক্রমাগত অ্যাডাপটেশন/আপগ্রেডেশন/মডিফিকেশন দরকার পড়ে। লকড সিস্টেমে এসব পরিবর্তন সহজসাধ্য নয়। একদিকে খরুচে, অন্যদিকে ব্যাপক সময় চলে যায়। বিদেশি সফটওয়্যার হলে মাসের পর মাস চলে যায় শুধু বুঝাইতে যে কী দরকার/কেন দরকার! একদিকে লাইসেন্স ফি যায় অন্য দিকে উচ্চ চেঞ্জ ফি/আপগ্রেডেশন ফি। দিনশেষে অটোমেশন নামধারী হলেও সফটওয়্যারগুলো দিয়ে নাগরিকদের সেবা দেওয়া যায় না। এসব নিয়ে ভাবতে হবে’- যোগ করেন তিনি।
তার এই আহ্বানে এরই মধ্যে সাড়া দিতে শুরু করেছেন প্রযুক্তি বোদ্ধা ও উদ্যোক্তারা। বিডিসাফ সাধারণ সম্পাদক মুহিব্বুল মুক্তাদির বলেছেন, Vendor Lock ও ক্লোজড সিস্টেম থেকে বেরিয়ে আসতে হলে রাষ্ট্রীয়ভাবে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে—সরকারি অর্থে কেনা সফটওয়্যারের সোর্স কোডের মালিকানা সরকারেই থাকতে হবে। ওপেন সোর্স প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং ডিজাইনে এমনভাবে ওপেন API ও ইন্টার-অপারেবিলিটি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নির্দিষ্ট কোনো ভেন্ডরের উপর নির্ভরতা না গড়ে ওঠে। সব চুক্তিতে লাইসেন্স, রিনিউয়াল ও কনফিগারেশনের খরচ স্বচ্ছভাবে উল্লেখ করতে হবে। পাশাপাশি Escrow Agreement-এর মাধ্যমে সোর্স কোড নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষের কাছে রাখলে ভবিষ্যতে ভেন্ডর সেবা বন্ধ করলেও সিস্টেম চালু রাখা যাবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব প্রযুক্তি টিম গড়ে তুলে ছোটখাটো পরিবর্তন নিজেরা করার সক্ষমতা অর্জন করা জরুরি। আইনি সংস্কারের মাধ্যমে সোর্স কোড, IPR ও Exit Clause সংক্রান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যমান ঝুঁকিপূর্ণ সিস্টেমগুলো পর্যায়ক্রমে পর্যালোচনা করে রেড টিম অডিটের মাধ্যমে মুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। কোন সফটওয়্যার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তা চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট নীতি থাকা উচিত। সর্বোপরি, এসব প্রযুক্তিগত বিনিয়োগে জনগণের অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে জরুরি।
কর্নারস্টোন স্ট্রাটেজিস কো-ফাউন্ডার মুনির হাসান বলেছেন, সোর্স কোডের মালিকানা পাওয়া এবং টেকনোলজি ট্রান্সফার বাধ্যতামূলক করা উচিত। এবং নিজস্ব টিম তৈরি করা উচিত যারা প্রয়োজনীয় ছোট এবং মাঝারি এডাপ্টেশন যেন করতে পারে! প্রতিটি চুক্তিতে প্রভিশন থাকা উচিত যাতে অন্তত পক্ষে দুই বছর পর পর রিনিগোশিয়েট করা যায় এবং প্রয়োজনে নতুন সিস্টেমের জন্য টেন্ডার করা যায়। যদিও রিপ্লেসমেন্ট অনেক কঠিন কিন্তু তারপরেও করতে হবে খরচ কমানোর জন্য!
শোয়াইব মোহাম্মাদ বলেছেন, ফ্রান্স এবং জার্মানির মডেল দেখেন। ওরা এখন সরকারি কাজে ওপেন সোর্স সফটওয়্যারের ব্যবহার বাড়াচ্ছে। জনগণের টাকায় কেনা সফটওয়্যারের সোর্স কোডও জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকতে হবে। যেখানে ওপেন সোর্স সফটওয়্যার আছে সেখানে সেটার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেন। ওপেন সোর্স সফটওয়্যার না থাকলে সোর্স কোডের মালিকানা পাওয়ার শর্তে ডেভেলপ করেন। প্রয়োজনে সেই কোম্পানি আরও ১০০ জায়গায় তার সোর্স কোড বিক্রি করুক তবে সরকারের যেন নিঃশর্ত ব্যবহারের অধিকার থাকে।






















