ঢাকা কলেজের ভূগোল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও ২৪তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা এ এস এম মুজাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে শিক্ষকতার মতো মহান পেশাকে উপেক্ষা করে ব্যক্তিগত সফটওয়্যার ব্যবসার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ‘ই-শিক্ষা’ নামক একটি সফটওয়্যার কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালনা করছেন এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এই সফটওয়্যার ব্যবহারে বাধ্য করতে মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ককে কাজে লাগাচ্ছেন।
এই বিষয়ে একটি সুষ্ঠু তদন্তের জন্য বিভিন্ন মহল থেকে দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, মুজাহিদুল ইসলাম সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও ‘ই-শিক্ষা’ নামক একটি এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার কোম্পানির নেপথ্যে থেকে এর কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। কাগজে-কলমে তার স্ত্রীর নাম থাকলেও সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এটি ‘মুজাহিদ স্যারের কোম্পানি’ নামেই পরিচিত।
সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক নেহাল আহমেদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলে তিনি তার ব্যবসার বিস্তার ঘটান। অভিযোগ রয়েছে, সফটওয়্যারটির মান তেমন উন্নত না হওয়া সত্ত্বেও এবং বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দাম রাখার পরেও, ডিজি নাম ব্যবহার করে এবং বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত তার বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তাদের প্রভাব খাটিয়ে ১০০টিরও বেশি সরকারি কলেজে এই সফটওয়্যার চালু রাখতে বাধ্য করা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান প্রধান এই সফটওয়্যার পরিবর্তন করতে চাইলে তাকে বদলি বা চাকরিচ্যুত করার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘ই-শিক্ষা’ সফটওয়্যারটি মূলত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন, ছাত্র ছাত্রী উপস্থিতি, পরীক্ষার ফলাফল এবং অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সফটওয়্যারটি অসম্পূর্ণ হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো নানা রকম সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে অডিটকালীন জটিলতা তৈরি করতে পারে। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, এই সফটওয়্যারের জন্য বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থ আদায় করা হয় এবং সেই অতিরিক্ত অর্থের একটি বড় অংশ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা শিক্ষা ভবনের কর্মকর্তাদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়।
এছাড়াও, কয়েক বছর আগে শেষ হওয়া বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত কলেজ শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্পের (সিইডিপি) আওতায় বিভিন্ন কলেজের অধ্যক্ষদের সঙ্গে যোগসাজশে মুজাহিদ কোটি টাকারও বেশি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, নিজের সফটওয়্যার ব্যবসা পরিচালনার জন্য মুজাহিদুল ইসলামকে প্রায়ই দেশের বিভিন্ন জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সফর করতে দেখা যায়। এর ফলে তিনি তার মূল দায়িত্ব, অর্থাৎ ঢাকা কলেজে ভূগোল বিভাগের ক্লাস নেওয়া ও অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রমে নিয়মিত অনুপস্থিত থাকছেন, যা শিক্ষক হিসেবে তার কর্তব্যে চরম অবহেলার সামিল।
ই-শিক্ষা লিমিটেডের কোম্পানি নথি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদিত মূলধন এক কোটি টাকা। ১০০ টাকা মূল্যের এক লাখ সাধারণ শেয়ার ইস্যুর অনুমোদন রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। এর মধ্যে তিন হাজার শেয়ারের মালিক মুজাহিদুল ইসলামের সহধর্মিণী আফিফা ইয়াসমিন। ই-শিক্ষা লিমিটেডের চেয়ারম্যানও তিনি। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনৈক শামসুদ্দিন আহমেদ। তিনিও তিন হাজার শেয়ারের মালিক। ই-শিক্ষার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক খাতা-কলমে গোপন রাখতে, প্রতিষ্ঠানটিতে নিজের নামে কোনো শেয়ার রাখেননি মুজাহিদুল ইসলাম।
অন্যদিকে, ই-শিক্ষা সফটওয়্যার সেবা দিলেও, বেসিসে প্রতিষ্ঠানটির কোনো সদস্যপদ নেই। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী, সফটওয়্যার খাতের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে আবশ্যিকভাবে বেসিসের সদস্য পদ নিতে হবে। তবে বেসিসের ওয়েবসাইটে প্রদর্শিত সদস্য তালিকায় নেই ই-শিক্ষার নাম। বেসিসের একটি সূত্রও নিশ্চিত করেছেন, ই-শিক্ষার বেসিসে সদস্য পদ নেই। উপরন্তু, দেশের সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় বেসিস সদস্য প্রতিষ্ঠানকে প্রাধান্য দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। অথচ বেসিসের সদস্য না হয়েই, প্রায় অর্ধশত সরকারি কলেজে সফটওয়্যার সেবা দিচ্ছে ই-শিক্ষা। বেসিস সদস্যরা বলছেন, ই-শিক্ষার এমন কর্মকা- বেসিস সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈষম্যমূলক।
অভিযোগ সম্পর্কে জানতে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও এ এস এম মুজাহিদুল ইসলামের স্ত্রী আফিফা ইয়াসমিন এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততা দেখিয়ে ফোন কেটে দেন। সরেজমিন অনুসন্ধানে ‘ই-শিক্ষা’র ওয়েবসাইটে যে ঠিকানা দেওয়া রয়েছে, সেই অনুযায়ী রাজধানীর একটি কমার্শিয়াল টাওয়ারে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, সেখানকার নিরাপত্তা প্রহরী ‘ই-শিক্ষা’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানকে চেনেন না। ভবনটিতে কোনো সফটওয়্যার কোম্পানি আছে কি না জানতে চাইলে, তিনি সেরকম কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
অনুসন্ধানে টাওয়ারের পাঁচতলার পাঁচ নম্বর কক্ষে যাওয়া হলে দেখা যায়, সেটি মূলত একজন ডাক্তারের চেম্বার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরিদর্শনের সময় চেম্বারটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল। ভবনের কেউই সেখানে নিয়মিত কোনো সফটওয়্যার কোম্পানির কার্যক্রম চলার বিষয়ে কিছু বলতে পারেননি।
এই পরিস্থিতি একটি গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে: যে প্রতিষ্ঠানটি দেশের প্রথম সারির শতাধিক সরকারি কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের বেতন, পরীক্ষার ফলাফল এবং অভ্যন্তরীণ ডেটার মতো সংবেদনশীল তথ্য ব্যবস্থাপনা করছে, তাদের যদি একটি দৃশ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কার্যালয়ই না থাকে, তাহলে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হয় কোথা থেকে? তাদের সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ ডেটার সুরক্ষাই বা কোথায়? বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি বৈধ প্রতিষ্ঠানের জন্য নিবন্ধিত ঠিকানায় কার্যক্রম না থাকাটা অস্বাভাবিক এবং এটি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এই পরিস্থিতিতে, একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন অনৈতিক ও বেআইনি কার্যক্রমের বিরুদ্ধে একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।






















