দেশের প্রচলিত আইন ও নিয়ম-নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রকাশ্যেই ‘আনঅফিসিয়াল’ বা অবৈধভাবে আমদানি করা মোবাইল ফোন বিক্রি করছে ‘এসএমএস গেজেট’ (SMS Gadget) নামের একটি প্রতিষ্ঠান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং তাদের আউটলেটে ঘোষণা দিয়েই তারা এই কার্যক্রম চালাচ্ছে, যা নিয়ে বৈধ মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এই ধরনের অবৈধ বা ‘গ্রে মার্কেট’ ব্যবসার কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, বৈধ ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার শিকার হচ্ছেন এবং ক্রেতারা ওয়ারেন্টিসহ বিক্রয়োত্তর সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে প্রতারিত হচ্ছেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসএমএস গেজেট তাদের ফেসবুক পেজ এবং ওয়েবসাইটে প্রতিটি নতুন মডেলের ফোনের দুটি মূল্য তালিকা প্রকাশ করে— একটি ‘অফিসিয়াল’ এবং অন্যটি ‘আনঅফিসিয়াল’। আনঅফিসিয়াল ফোনের দাম অফিসিয়ালের চেয়ে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কম হওয়ায় অনেক ক্রেতাই সেদিকে আকৃষ্ট হচ্ছেন।
উদাহরণস্বরূপ, যে আইফোন বা স্যামসাং ফোনের অফিসিয়াল মূল্য ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা, সেই একই মডেলের আনঅফিসিয়াল সংস্করণ তারা ১ লক্ষ ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকায় বিক্রির বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। এই বিশাল দামের পার্থক্যের মূল কারণ হলো সরকারি শুল্ক ও কর ফাঁকি দেওয়া। বৈধ পথে আমদানি করা প্রতিটি ফোনের জন্য সরকারকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ট্যাক্স দিতে হয়, যা আনঅফিসিয়াল ফোনের ক্ষেত্রে এড়িয়ে যাওয়া হয়।
প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েই আনঅফিশিয়াল ফোন বিক্রি করলেও নিয়ন্ত্রণ সংস্থা রয়েছে নীরব। অদৃশ্য কারণে আনঅফিসিয়াল ফোন বা সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া ফোন উদ্ধার অভিযানও রয়েছে বন্ধ। সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে বসুন্ধরা, যমুনা ফিউচার পার্কসহ দেশে ব্যাপক গড়ে উঠেছে অবৈধ ফোনের রমরমা ব্যবসা।

কম দামের আকর্ষণে ক্রেতারা আনঅফিসিয়াল ফোন কিনলেও, এর পেছনে রয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকি ও প্রতারণার ফাঁদ।
ওয়ারেন্টি নেই: এসব ফোনে ব্র্যান্ডের কোনো অফিসিয়াল ওয়ারেন্টি থাকে না। ফলে এক বা দুই বছরের যে বিক্রয়োত্তর সেবা, তা থেকে ক্রেতারা পুরোপুরি বঞ্চিত হন।
নকল বা রিফার্বিশড ফোনের ঝুঁকি: অনেক সময় অসাধু ব্যবসায়ীরা পুরনো বা ব্যবহৃত ফোনকে নতুন বলে চালিয়ে দেয়, যা ধরার কোনো উপায় সাধারণ ক্রেতার থাকে না।
বিক্রয়োত্তর সেবার অভাব: ফোনের কোনো সমস্যা হলে অফিসিয়াল সার্ভিস সেন্টারে কোনো সেবা পাওয়া যায় না।
এসএমএস গেজেটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন অবাধ কার্যক্রমের কারণে দেশের বৈধ মোবাইল ফোন আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা সরকারকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব দিয়ে ব্যবসা করছি, আর কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে আমাদের বাজার নষ্ট করে দিচ্ছে। আমরা যদি ১৮০,০০০ টাকার ফোন বিক্রি করি, আর তারা যদি ১৪০,০০০ টাকায় বিক্রি করে, তাহলে প্রতিযোগিতা কীভাবে হবে? আমরা বিটিআরসি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাছে এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”
প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে দিনের পর দিন এই অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ ধরনের অবৈধ ব্যবসা বন্ধে দ্রুত কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা না হলে দেশের মোবাইল ফোনের বাজার একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির দিকে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।






















