অবৈধ মোবাইল ফোন আমদানি বন্ধ করে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে এবং সরকারের রাজস্ব ক্ষতি ঠেকাতে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) ব্যবস্থা চালু করা হলেও তা এখন অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে। অভিযোগ উঠেছে, ২০২১ সালে চালুর পরপরই তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী উপদেষ্টাদের নির্দেশে এই সিস্টেমটি বন্ধ করে দেওয়া হয়, যার ফলে দেশীয় হ্যান্ডসেট নির্মাতারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং সরকার বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ২০১৯ সালে সিনেসিস আইটি, উইপ্রো এবং রেডিসন টেকনোলজির একটি যৌথ উদ্যোগের সাথে প্রায় ৩০ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশে অবৈধভাবে আনা, ক্লোন করা বা চুরি হওয়া মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা। ২০২১ সালের জুলাই মাসে বিটিআরসি অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে সিস্টেমটি চালু করে।
কিন্তু চালুর কিছুদিন পরই প্রকল্পটি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসে। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের সরাসরি নির্দেশে এনইআইআর সিস্টেমের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।
এনইআইআর চালুর ঠিক আগের দিন, একটি মোবাইল ফোন কোম্পানির কারখানা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান হঠাৎ করেই ঘোষণা দেন যে, দেশে অবৈধ মোবাইল ফোন বন্ধ হবে না।
হঠাৎ করেই ঘোষণা এই ঘোষণা পরে মাথায় হাত পর দেশে কারথানা করা ১০টি ফোন কোম্পানির। ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার সিস্টেম তৈরি নামে সরকারি কোষাগার থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা চলে যায় গচ্চা ।
আরও পড়ুন: ঘোষণা দিয়ে অবৈধ হ্যান্ডসেট ‘বিক্রি করছে’ এসএমএস গেজেট
সালমান এফ রহমানের হঠাৎ করেই ঘোষণার এর ঠিক পরের দিনই তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার গণমাধ্যমকে জানান, “সজীব ওয়াজেদ জয়ের নির্দেশে আমরা অবৈধ মোবাইল ফোন বন্ধের যে সিস্টেম ডেভেলপ করেছিলাম, সেটা চালু করবো না।”

এই ঘটনাপ্রবাহকে একটি পরিকল্পিত চক্রান্তের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এমনকি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বিটিআরসি আবারও অবৈধ মোবাইল ফোন বন্ধের ঘোষণা দিলেও, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ের একই সিন্ডিকেটের চাপে সেই উদ্যোগও ব্যর্থ হয়ে যায়।
অভিযোগ উঠেছে যে, সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপ এর সাথে শেয়ার দিয়ে ব্যবসা করছে দেশের বেশ কিছু জনপ্রিয় গ্যাজেট শপ। সালমান এফ রহমান, তার ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান এবং আরও কিছু ব্যবসায়ীকে নিয়ে অবৈধ মোবাইল ফোনের এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।
আরও পড়ুন: অবৈধ পথে মোবাইলফোনে কোটি কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকি ৪ মোবাইল শপের
অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, এই হাজার কোটি টাকার অবৈধ বাজার থেকে প্রতি মাসে বিপুল অংকের কমিশন সরাসরি জুনাইদ আহমেদ পলক, সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সালমান এফ রহমানের কাছে পৌঁছাত। নিজেদের এই অবৈধ বাণিজ্যকে সুরক্ষা দিতেই তারা রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ও নিরাপত্তার স্বার্থে তৈরি করা এনইআইআর প্রকল্পটিকে থামিয়ে দেন।
এই সিদ্ধান্তটি দেশের মোবাইল ফোন উৎপাদন শিল্পের জন্য একটি বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিটিআরসির তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ১৭টি প্রতিষ্ঠান হ্যান্ডসেট নির্মাণ করছে, যা দেশের মোট চাহিদার ৯৯ শতাংশ পূরণে সক্ষম। এনইআইআর ব্যবস্থা কার্যকর থাকলে অবৈধ হ্যান্ডসেটের আমদানি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসত এবং দেশীয় কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারত। কিন্তু সিস্টেমটি বন্ধ থাকায় চোরাই ও অবৈধ হ্যান্ডসেটের বাজার এখনো সক্রিয়, যার ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি কার্যকর ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে তা বন্ধ করে দেওয়াটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এর ফলে একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয়েছে, তেমনি দেশীয় শিল্পের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং অবৈধ বাণিজ্য উৎসাহিত হচ্ছে।
প্রযুক্তি বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, চোরাই হ্যান্ডসেটে অবাধ বাজারজাতের কারণে দেশি নির্মিত হ্যান্ডসেটের উৎপাদনে ধ্বস নেমেছে। উৎপাদন কমেছে ৪০ শতাংশের বেশি। এনইআইআর পুরোপুরি কার্যকর হলে নেটওয়ার্কে সিম ও হ্যান্ডসেট লক করার সুবিধা পাওয়া যাবে বলে মনে করেন মোবাইল অপারেটররা। এই সুবিধা নিশ্চিত করা হলে নেটওয়ার্ক থেকে চোরাই হ্যান্ডসেট বিচ্ছিন্ন করা যাবে। অন্যদিকে, কিস্তি ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধায় ক্রেতার কাছে স্মার্টফোন সহজলভ্য করা সম্ভব।
প্রতিদিন দেশে প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ মোবাইল ফোন চুরি বা ছিনতাই হয়, যার মধ্যে মাত্র সামান্য অংশই উদ্ধার করা সম্ভব। তাই ফোন ব্যবহারকারীদের সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি। ডিএমপির এক কর্মকর্তা জানান, “ছিনতাই, চুরি বা হারানো মোবাইল ফোনের ৩০ শতাংশই আমরা উদ্ধার করতে পারি, বাকি ৭০ শতাংশ চলে যায়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ টেকজুম ডটটিভিকে বলেন, এনইআইআর প্রকল্পে ইতিমধ্যে ১৯ কোটি টাকা হাওয়া করে দিয়েছে বিটিআরসি। গত সরকারের সময়ে নেওয়া প্রকল্পের অগ্রগতি কেন হলো না এ নিয়ে এখন পর্যন্ত কোন উত্তর বিটিআরসির কাছে নেই। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রকৃতপক্ষে যারা আমদানি কারক এবং উৎপাদনকারী আছেন তাদের অনেকেই চায়না। কিছুদিন আগে একজন আমদানি কারক বলছিলেন উনি ৫০০০ পিস আইফোন আমদানি করেছিলেন তার মধ্যে উনি বিক্রি করতে পেরেছেন মাত্র ৫২০ পিস। অথচ মোবাইল অপারেটরদের কাছে তথ্য নিয়ে জানতে পারলাম ওই মাসে দেশে আইফোন সক্রিয় হয়েছে প্রায় ১০ হাজার পিস। সরকারের উচিত হবে এই প্রকল্প নিয়ে জনগণের মাঝে সচেতনতা তৈরি করা। এনইআইআর প্রকল্প চালু করলে দেশে অবৈধ ফোনের বাজার যেমন কমবে বাড়বে সরকারের রাজস্ব একইভাবে চুরি এবং ছিনতাই কমে যাবে।






















