আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশ বন্ধ হতে চলেছে সব অবৈধ মুঠোফোন (মোবাইল ফোন)। অর্থাৎ, যেসব মুঠোফোনের আইএমইআই (ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি) নাম্বার অবৈধ (ক্লোন) হবে সেগুলো ১৬ ডিসেম্বর থেকে দেশের কোনো মোবাইল নেটওয়ার্কে আর সচল থাকবে না।
উল্লেখ্য, আইএমইআই নাম্বার হচ্ছে মুঠোফোন শনাক্তকরণ নম্বর। বিশ্বের প্রতিটি মোবাইল ফোন বা হ্যান্ডসেটেরই অন্তত একটি করে আইএমইআই নাম্বার থাকে, যেটা ফোনটিকে অন্যান্য হ্যান্ডসেট থেকে আলাদা করে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, অবৈধ মুঠোফোন বন্ধ হলে বছরে সরকারের প্রায় ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে এবং ডিজিটাল জালিয়াতিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
বাংলাদেশ সরকার দেশের বাজারে অবৈধ মুঠোফোন বা হ্যান্ডসেটের বিস্তার রোধে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে আগামী ১৬ ডিসেম্বরে থেকে দেশে সকল প্রকার অবৈধ হ্যান্ডসেট বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সরকার অচিরেই ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার বা এনইআইআর নামে একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম চালু করতে যাচ্ছে।
গত বুধবার (২৯ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিটিআরসি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দেশে অবৈধ মুঠোফোনের ব্যবহার বন্ধ করা প্রসঙ্গে কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৭৩ শতাংশ ডিজিটাল জালিয়াতি হয় অবৈধ ডিভাইস ও সিম থেকে। এনইআইআর চালুর মাধ্যমে তা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। অবৈধ মোবাইল ফোন হ্যান্ডসেটের কারণে প্রতিবছর সরকারের ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) জানিয়েছে, নতুন এ ব্যবস্থায় শুধু অনুমোদিত, মানসম্মত ও বৈধভাবে আমদানি করা মুঠোফোন সংযুক্ত হতে পারবে। অবৈধ বা ক্লোন আইএমইআই (মুঠোফোন শনাক্তকরণ নম্বর) মুঠোফোন নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হতে পারবে না।
অর্থাৎ, এনইআইআর নামের নতুন এই প্ল্যাটফর্ম তৈরির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে অনুমোদনহীন এবং অবৈধ উপায়ে আমদানিকৃত মোবাইল হ্যান্ডসেট সরিয়ে ফেলা। পাশাপাশি অনুমোদিত, মানসম্মত এবং বিদেশ থেকে বৈধভাবে আমদানিকৃত মুঠোফোনগুলোকে সঠিক ও বৈধ উপায়ে দেশের বিদ্যমান মোবাইল নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।
বিটিআরসি আরও জানিয়েছে, বিটিআরসি জানিয়েছে, ১৬ ডিসেম্বর থেকে যেকোনো মাধ্যম থেকে (বিক্রয়কেন্দ্র, অনলাইন বিক্রয়কেন্দ্র, ই-কমার্স সাইট ইত্যাদি) মুঠোফোন কেনার আগে অবশ্যই তার বৈধতা যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি মুঠোফোন কেনার রশিদ সংরক্ষণ করতে হবে। মুঠোফোন বৈধ হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এনইআইআর ব্যবস্থায় নিবন্ধিত হয়ে যাবে।
নতুন মুঠোফোন কেনার ক্ষেত্রে বৈধ ফোন চেনার উপায়
আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে দেশের যেকোনো বিক্রয়কেন্দ্র, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা ই-কমার্স সাইট থেকে মুঠোফোন কেনার আগে অবশ্যই জেনে নিতে হবে ফোনটি বৈধ কি-না। মুঠোফোনের বৈধতা যাচাই করার প্রক্রিয়াটি বেশ সহজ। গ্রাহক কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করে সহজেই তা জেনে নিতে পারেন।
১। গ্রাহক তার মুঠোফোনের মেসেজ অপশনে যাবেন। এবারে টাইপ করবেন: KYD ১৫ ডিজিটের আইএমইআই নম্বর। এই যেমন: KYD 101010101010101
২। এবারে মেসেজটি ১৬০০২ নম্বরে পাঠিয়ে দেবেন।
৩। ফিরতি মেসেজে গ্রাহক তার মুঠোফোনের বৈধতা সম্পর্কে জেনে যাবেন।
এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, বৈধতা যাচাইয়ের পাশাপাশি মুঠোফোন কেনার রশিদ অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে। মুঠোফোনটি বৈধ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা এনইআইআর ব্যবস্থায় নিবন্ধিত হয়ে যাবে।
ফোনের আইএমইআই নাম্বারটি ক্লোন বা নকল না হলে, সহজেই সম্পন্ন হবে হ্যান্ডসেটের নিবন্ধন।
বর্তমানে ব্যবহৃত মুঠোফোনটি বৈধ কি না যাচাই করবেন যেভাবে
বর্তমানে মোবাইল নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত সকল বৈধ হ্যান্ডসেট আগামী ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধিত হবে। ফলে আলাদাভাবে নিবন্ধনের প্রয়োজন নেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, গ্রাহক বর্তমানে যে মুঠোফোনটি ব্যবহার করছেন, সেটি বৈধ কি না তা জানার উপায় কী? উপায় আছে।
১। প্রথমে হ্যান্ডসেট থেকে *১৬১৬১# নম্বরে ডায়াল করতে হবে।
২। এবারে স্ক্রিনে একটি অটোমেটিক বক্স আসবে। সেখানে হ্যান্ডসেটের ১৫ ডিজিটের আইএমইআই নম্বরটি লিখে পাঠিয়ে দিতে হবে, অর্থাৎ সেন্ড করতে হবে।
৩। ফিরতি মেসেজে (এসএমএস-এ) ব্যবহৃত হ্যান্ডসেটের হালনাগাদ অবস্থা জেনে যাবেন গ্রাহক।
এছাড়াও, গ্রাহক এনইআইআর পোর্টালে (neir.btrc.gov.bd) ভিজিট করে, অথবা মোবাইল অপারেটরের কাস্টমার কেয়ার সেন্টারের সাহায্যে নিজের ব্যবহৃত মুঠোফোন বা হ্যান্ডসেটটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারবেন।
বিদেশ থেকে কেনা বা উপহার পাওয়া মুঠোফোনের নিবন্ধন প্রক্রিয়া
বিদেশ থেকে ব্যক্তিপর্যায়ে কেনা বা উপহার পাওয়া একটি মুঠোফোন প্রাথমিকভাবে দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে সচল হবে। তবে পরবর্তীতে এই ফোনগুলোকে অবশ্যই নিবন্ধন করে নিতে হবে।
প্রাথমিকভাবে সচল হওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে অনলাইনে প্রয়োজনীয় তথ্য দাখিলের জন্য গ্রাহককে এসএমএস-এর মাধ্যমে নির্দেশনা দেওয়া হবে। এরপর গ্রাহকের দাখিলকৃত সকল তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের পর কেবলমাত্র বৈধ ফোনগুলোই নেটওয়ার্কে সচল থাকবে।
এবারে চলুন বিদেশ থেকে ব্যক্তিগতভাবে আনা ফোনের অনলাইন নিবন্ধনের প্রক্রিয়াটি জেনে নেওয়া যাক:
১। গ্রাহককে প্রথমেই এনইআইআর পোর্টালে (neir.btrc.gov.bd) যেতে হবে এবং প্রয়োজনীয় তথ্যাদি দিয়ে নিজের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট রেজিস্টার করতে হবে।
২। এবারে পোর্টালের স্পেশাল রেজিস্ট্রেশন (Special Registration) সেকশনে গিয়ে মুঠোফোনের আইএমইআই নম্বর দিতে হবে।
৩। এই পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টের ছবি বা স্ক্যান কপি যেমন: পাসপোর্টের ভিসা/ইমিগ্রেশন, ফোনটি ক্রয়ের রশিদ ইত্যাদি আপলোড করে সাবমিট বাটনে চাপ দিতে (প্রেস করতে) হবে।
৪। হ্যান্ডসেটটি বৈধ হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধিত হবে। তবে বৈধ না হলে গ্রাহককে এসএমএসের মাধ্যমে তা জানিয়ে দেওয়া হবে এবং ফোনটিকে মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করা হবে।
ব্যক্তিপর্যায়ে বিদেশ থেকে ফোন নিয়ে আসার ক্ষেত্রে মনে রাখা আবশ্যক যে, বাংলাদেশে বিদ্যমান ব্যাগেজ রুলস (আমদানি বিধিমালা) অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি বিদেশ থেকে দেশের নেটওয়ার্কে ইতোপূর্বে ব্যবহৃত নিজের ব্যক্তিগত একটি ফোন বাদে সর্বোচ্চ আর একটি মুঠোফোন বিনা শুল্কে দেশে আনতে পারবেন। আর শুল্ক দেওয়া সাপেক্ষে আরও একটি অতিরিক্ত ফোন নিয়ে আসতে পারবেন।
অর্থাৎ, বিদেশ থেকে আগত বাংলাদেশিরা নিজের ব্যক্তিগত ফোনটি ছাড়া সর্বোচ্চ একটি ফোন বিনা শুল্কে, এবং অতিরিক্ত আর একটি ফোন শুল্ক দিয়ে দেশে নিয়ে আসতে পারবেন।
নিবন্ধিত মুঠোফোন ‘ডি-রেজিস্ট্রেশন’ করার উপায়
নিবন্ধিত মুঠোফোনকে গ্রাহক যদি বিক্রি বা হস্তান্তর করতে চায় সেক্ষেত্রে আগে হ্যান্ডসেটটিকে ‘ডি-রেজিস্ট্রেশন’ করতে হবে।
ডি-রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে অবশ্যই গ্রাহকের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দিয়ে নিবন্ধিত একটি সিম ফোনে থাকতে হবে এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের শেষ চার ডিজিট উল্লেখ করতে হবে।
নিবন্ধিত ফোন বিক্রি বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে। ডি-রেজিস্ট্রেশন করা যাবে চারটি মাধ্যমে:
১। সিটিজেন পোর্টাল (neir.btrc.gov.bd)
২। মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর (এমএনও) পোর্টাল
৩। মোবাইল অ্যাপস
৪। ইউএসএসডি চ্যানেল (*১৬১৬১#)
ডি-রেজিস্ট্রেশনের ২টি শর্ত
নিবন্ধিত হ্যান্ডসেট ডি-রেজিস্ট্রেশন করার ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত দুটি শর্ত মানতে হবে:
১। ডি-রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে গ্রাহক তার ফোনে যে সিমটি ব্যবহার করছেন তা অবশ্যই নিজের এনআইডি দিয়ে নিবন্ধিত হতে হবে।
২। ক্লোন বা ডুপ্লিকেট আইএমইআই নম্বর যুক্ত হ্যান্ডসেট ডি-রেজিস্ট্রেশন করার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তথ্য হিসেবে পরবর্তী ব্যবহারকারীর সিম নম্বর প্রদান করতে হবে।
করপোরেট সিম ডি-রেজিস্ট্রেশন করার উপায়
কর্পোরেট সিম ব্যবহারকারী গ্রাহকদেরকে ৩০ দিনের মধ্যে ইউএসএসডি চ্যানেল (*১৬১৬১#) অথবা সিটিজেন পোর্টালের মাধ্যমে নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সম্পর্কিত তথ্য প্রদান করতে এসএমএস-এর মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে।
প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দেওয়া সাপেক্ষে গ্রাহক নিজের এনআইডি অথবা কি-কনটাক্ট-পয়েন্টের (কেসিপি) এনআইডি ব্যবহার করে মুঠোফোনের ডি-রেজিস্ট্রেশন করে নিতে পারবেন। আর তা না হলে, কেবলমাত্র কি-কন্টাক্ট-পয়েন্টের এনআইডি’র তথ্য দিয়ে ডি-রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা যাবে।
চুরি বা হারিয়ে গেলে মুঠোফোনটি ব্লক করার উপায়
নিবন্ধিত মুঠোফোনটি চুরি হলে বা হারিয়ে গেলে সিটিজেন পোর্টাল (neir.btrc.gov.bd) বা মোবাইল অ্যাপস, অথবা মোবাইল অপারেটরের গ্রাহক সেবাকেন্দ্রের মাধ্যমে ব্যবহারকারী যেকোনো সময় হ্যান্ডসেটটি লক বা আনলক করতে পারবেন।
উল্লেখ্য, ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার বা এনইআইআর প্ল্যাটফর্ম সম্পর্কিত যেকোনো বিষয়ে তথ্য জানতে বিটিআরসি’র হেল্প ডেস্ক নম্বরে (১০০), অথবা সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরের গ্রাহকসেবা নম্বরে (১২১) ডায়াল করতে পারেন মুঠোফোন ব্যবহারকারীরা।






















