অবশেষে দেশের মোবাইল অপারেটরদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হলো। কিস্তিতে স্মার্টফোন বিক্রির ক্ষেত্রে ফোনের সব সিম স্লট ‘লক’ রাখার সুযোগ পাচ্ছে অপারেটররা। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) ৩০০তম কমিশন সভায় এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে।
গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ওই সভার সিদ্ধান্তের বিবরণী অনুযায়ী, এই অনুমোদনের ফলে মোবাইল অপারেটররা তাদের নেটওয়ার্কের সঙ্গে ফোনকে লক করে কিস্তিতে বিক্রি করতে পারবে।
‘সিম লকিং’ কী এবং শর্ত কী?
সিম লকিং বা নেটওয়ার্ক লকিং হলো, গ্রাহক যে অপারেটর থেকে কিস্তিতে স্মার্টফোন কিনবেন, কিস্তির সময়কাল বা সম্পূর্ণ বকেয়া পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত ওই ফোনে অন্য কোনো অপারেটরের সিম বা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা যাবে না।
বিটিআরসি জানিয়েছে, গ্রাহক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব বকেয়া পরিশোধ করার পর, অপারেটরকে অবশ্যই ডিভাইসটি আনলক করে দিতে হবে, যাতে গ্রাহক তার পছন্দ অনুযায়ী যেকোনো অপারেটরের সিম ব্যবহার করতে পারেন।
এছাড়াও, মুঠোফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ‘ডিভাইস লকিং’ অ্যাপসের মাধ্যমেও স্মার্টফোন কিস্তিতে বিক্রয় করা যাবে। অর্থাৎ, সিম বা নেটওয়ার্ক লকিং এবং ডিভাইস লকিং—উভয় পদ্ধতিতেই কিস্তিতে স্মার্টফোন বিক্রি করা যাবে।
অপারেটরদের দীর্ঘদিনের দাবি
মোবাইল অপারেটররা, বিশেষ করে গ্রামীণফোন ও রবি, দীর্ঘদিন ধরে স্মার্টফোনের সব সিম স্লট লক করার এই বিধান চেয়ে আসছিল। এর আগে ২০২৩ সালে বিটিআরসি একটি সিম লক রেখে কিস্তিতে স্মার্টফোন বিক্রির সিদ্ধান্ত দিয়েছিল। কিন্তু গ্রামীণফোন ও রবি তখন বিটিআরসির কাছে আবেদন করে জানায় যে, একটি সিম উন্মুক্ত রেখে কিস্তিতে ফোন বিক্রি করা তাদের জন্য বাণিজ্যিকভাবে সুবিধাজনক নয়।
যদিও তখন বাংলালিংক এই ‘সব সিম লক’ করার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, বড় অপারেটররা স্মার্টফোন বিক্রিতে ভর্তুকি দিয়ে বাজার দখলের চেষ্টা করবে, যার ফলে ছোট অপারেটররা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।
তবে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলালিংক বিটিআরসিকে চিঠি দিয়ে জানায়, সব স্লট লক রেখে কিস্তিতে ফোন বিক্রিতে তাদের আর আপত্তি নেই। তবে তারা নিজেদের প্রস্তুতির জন্য সময় চায় এবং আগামী জানুয়ারি (২০২৬) থেকে এই বিধান কার্যকরের অনুরোধ জানায়।
অন্যান্য বিধি-নিষেধ
বিটিআরসি আরও বলেছে, মোবাইল অপারেটররা সরাসরি স্মার্টফোন আমদানি, উৎপাদন বা সংযোজন করতে পারবে না। তবে তারা স্মার্টফোন উৎপাদনকারী বা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে পারবে এবং সেই চুক্তির মাধ্যমে বিটিআরসি অনুমোদিত স্মার্টফোন তারা গ্রাহকদের কাছে কিস্তিতে বিক্রি করতে পারবে।
কিস্তিতে স্মার্টফোন বিক্রির ক্ষেত্রে বিটিআরসির অনুমতি নিয়ে অপারেটররা বিভিন্ন প্যাকেজ ও বান্ডেল অফারও দিতে পারবে। তবে তাদের অবশ্যই দেশের প্রচলিত আর্থিক আইন, ব্যাংকিং বিধিমালা এবং ভোক্তা সুরক্ষা নীতিমালা মেনে চলতে হবে এবং গ্রাহকের ডিভাইসের তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞের মতামত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “এটি ভালো উদ্যোগ। যাঁরা একসঙ্গে অনেক টাকা দিয়ে স্মার্টফোন কিনতে পারেন না, তাঁদের জন্য সুবিধা হবে।”
তবে তিনি একটি সতর্কবার্তাও যোগ করেন, “কেউ যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সব টাকা দিতে না পারেন বা চুক্তি থেকে বের হয়ে যেতে চান, সে ক্ষেত্রে করণীয় কী হবে, তা উল্লেখ থাকা দরকার। অর্থাৎ, ‘শর্ত প্রযোজ্য’-এর বিষয়গুলো অবশ্যই স্পষ্ট থাকতে হবে।”
বিটিআরসি চলতি বছরের এপ্রিলে ডিভাইস লকিংয়ের মাধ্যমে স্মার্টফোন বিক্রির অনুমতি দেয়। এরপর স্মার্ট টেকনোলজি (বাংলাদেশ) লিমিটেড নাইজেরিয়াভিত্তিক আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান পামপের সঙ্গে যৌথভাবে এই পদ্ধতিতে স্মার্টফোন বিক্রি শুরু করে। বিটিআরসি জানিয়েছে, ডিভাইস লকিং চালুর পর স্মার্টফোন বিক্রি ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সংস্থাটি আশা করছে, এবার সব সিম বা নেটওয়ার্ক লকিংয়ের সুবিধা দেওয়ায় দেশে স্মার্টফোনের ব্যবহার আরও বাড়বে।






















