দেশের মোবাইল ফোনের ‘গ্রে’ মার্কেট বা অবৈধ বাজার নিয়ে যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তা শুল্ক ফাঁকির সাধারণ ধারণাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এটি এখন দেশের অর্থনীতির জন্য ‘দ্বিমুখী বিপদ’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একদিকে, অবৈধ পথে স্মার্টফোন আসায় সরকার হাজার হাজার কোটি টাকার শুল্ক থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে, এই অবৈধ ফোন আমদানির মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে দেশ থেকে প্রতি মাসে কোটি কোটি ডলার ‘হুণ্ডি’র মাধ্যমে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অবৈধ আমদানির মূল্য যেহেতু কোনো বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে (এলসি বা লেটার অব ক্রেডিট) পরিশোধ করা সম্ভব নয়, তাই পুরো অর্থটাই হুণ্ডির মাধ্যমে পাচার করতে হচ্ছে। এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে।
যেভাবে চলছে ডলার পাচার
‘গ্রে’ মার্কেটের ব্যবসায়ীরা, বিশেষ করে বসুন্ধরা সিটি বা যমুনা ফিউচার পার্কের মতো বড় কেন্দ্রগুলোর সিন্ডিকেট, চীন বা দুবাইয়ের বাজার থেকে এই ফোনগুলো সংগ্রহ করে। দেশে এসব ফোন নগদ টাকায় (বিডিটি) বিক্রি করা হয়।
কিন্তু চীনে সরবরাহকারীকে অর্থ পরিশোধ করতে হয় ডলারে বা ইউয়ানে। এই অর্থ পরিশোধের জন্য আমদানিকারকরা হুণ্ডি চক্রের শরণাপন্ন হন। তারা দেশীয় হুণ্ডি এজেন্টদের কাছে নগদ টাকা জমা দেন, সেই এজেন্টরা বিদেশে থাকা তাদের সহযোগীদের মাধ্যমে সরবরাহকারীকে বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থ পরিশোধ করে।
এর ফলে, এই বাণিজ্যের মাধ্যমে একটি ডলারও বৈধ পথে দেশে আসছে না, উল্টো দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা (ডলার) অবৈধ পথে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
অভিজাত মলে অবৈধ বাণিজ্যের স্বর্গরাজ্য
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বসুন্ধরা সিটি ও যমুনা ফিউচার পার্কের মতো অভিজাত মলগুলোর বিভিন্ন শোরুমই এই অবৈধ বাণিজ্যের নেতৃত্ব দিচ্ছে। অ্যাপল, স্যামসাং, গুগল পিক্সেল, শাওমি, মটোরোলার মতো শীর্ষ ব্র্যান্ডের হাই-এন্ড ফোনগুলো, যার প্রধান বিক্রেতা এই শোরুমগুলো।
অভিযোগ রয়েছে, “অ্যাপল গেজেট,” “গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ার,” “এসএমএম গেজেট,” “রিও ইন্টারন্যাশনাল,” “ড্যাজেল মোবাইল শপ” “গ্যাজেট অরবিট”-এর মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো, যাদের মূল শোরুমগুলো বসুন্ধরা সিটিতেই অবস্থিত, তারাই এই ‘আনঅফিসিয়াল’ বা অবৈধ ফোনের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। বৈধ আমদানিকারকদের চেয়ে তারা ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত কম দামে হ্যান্ডসেট বিক্রি করতে পারছে, কারণ এই ফোন আমদানিতে তাদের কোনো শুল্ক বা কর দিতে হচ্ছে না।
প্রতারণার ওপর প্রতারণা: ৭৫% ফোনই ‘রিফারবিশড’
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এই ‘গ্রে’ মার্কেটে আসা ফোনের প্রায় ৭৫ শতাংশই ‘রিফারবিশড’ বা সংস্কার করা পুরোনো ফোন। চীন থেকে এই ব্যবহৃত ফোনগুলো সংগ্রহ করে, সেগুলোকে পালিশ করে এবং নতুন প্যাকেটে ভরে হুবহু নতুনের মতো করে ফেলা হয়।
এই ‘রিফারবিশড’ ফোনগুলোই ‘আনঅফিসিয়াল’ ফোন হিসেবে দেশের বাজারে নতুন ফোনের দামে বিক্রি করা হচ্ছে। ক্রেতারা না বুঝেই পুরোনো ফোন কিনে প্রতারিত হচ্ছেন। মটোরোলার মতো কিছু ব্র্যান্ডের ফোন ভারতের বাজারের চেয়েও কম দামে বাংলাদেশে পাওয়ার পেছনে এই ‘রিফারবিশড’ ফোনগুলোকেই মূল কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এনইআইআর-এর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
সরকার আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে অবৈধ ফোন বন্ধের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়েছে এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যারা খোদ রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে বসেই তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্প্রতি “মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ” নামে যে সংগঠনটি এনইআইআর চালুর বিষয়ে ‘উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছে, তাদের মূল শক্তিই এই বসুন্ধরা সিটি-কেন্দ্রিক ব্যবসায়ীরা। অবৈধ ফোনের এই রমরমা বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাই তাদের এই ‘উদ্বেগ’-এর প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সরকার যদি সত্যিই এই ‘গ্রে’ মার্কেট বন্ধ করতে চায় এবং এনইআইআর সিস্টেমের সুফল পেতে চায়, তবে বিটিআরসি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবশ্যই প্রথমে বসুন্ধরা সিটির মতো প্রধান কেন্দ্রগুলোতে অভিযান পরিচালনা করতে হবে, যেখানে প্রকাশ্যেই এই অবৈধ ফোন বিক্রি হচ্ছে।
এনইআইআর (NEIR) সিস্টেমই কি সমাধান?
এই ত্রি-মুখী অপরাধ (শুল্ক ফাঁকি, ডলার পাচার এবং গ্রাহক প্রতারণা) বন্ধ করতেই সরকার আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR) ব্যবস্থা চালুর চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিয়েছে। এই সিস্টেম চালু হলে অবৈধভাবে আমদানি করা বা ‘রিফারবিশড’ কোনো ফোনই দেশের নেটওয়ার্কে সচল করা যাবে না।
আর এ কারণেই এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট (যারা অতীতে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এই সিস্টেম বন্ধ রেখেছিল বলে অভিযোগ) এখন আবারও এই উদ্যোগকে প্রতিহত করার চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এনইআইআর (NEIR) সিস্টেমের সফল বাস্তবায়ন এখন শুধু রাজস্ব আদায়ের বিষয় নয়, এটি দেশের ডলার পাচার রোধ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষার জন্যও অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।






















