দেশের মোবাইল ফোনের বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ অবৈধ ‘গ্রে’ মার্কেটের দখলে, যার ফলে সরকার বছরে ২,০০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারাচ্ছে। এই অবৈধ বাণিজ্য ২,৫০০ কোটি টাকার দেশীয় মোবাইল উৎপাদন শিল্পকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR) চালুর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (এমআইওবি)।
সংগঠনটি বলছে, এই উদ্যোগ দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষিত করার পাশাপাশি বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাবে এবং গ্রাহকদের অধিকার নিশ্চিত করবে।
২,৫০০ কোটির দেশীয় শিল্প ঝুঁকির মুখে এমআইওবি’র তথ্যমতে, ২০১৭ সালে দেশে মোবাইলফোন উৎপাদন শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে দেশি ও বিদেশি মিলে প্রায় ১৭টি মোবাইলফোন কারখানা দেশে উৎপাদন কার্যক্রম চালাচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো ২,৫০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছে, যেখানে সরাসরি ১ লক্ষাধিক ও পরোক্ষভাবে ৩ লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
এর সহযোগী শিল্প হিসেবে প্যাকেজিং, ব্যাটারি, চার্জার ও ডেটা কেবলের মতো যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানাও গড়ে উঠেছে। এই সহযোগী খাতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
সংগঠনটি জানায়, দীর্ঘদিন ধরে এই বৈধ শিল্পের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অবৈধ বা “গ্রে” হ্যান্ডসেটের প্রবেশ। বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ এই অবৈধ মার্কেটের দখলে থাকায় সরকার বছরে ২,০০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারাচ্ছে এবং বাজার চোরাকারবারিদের হাতে চলে যাচ্ছে। বিটিআরসি’র ১৬ ডিসেম্বর থেকে এনইআইআর চালুর ঘোষণার মাধ্যমে অবৈধভাবে আমদানিকৃত বা নিবন্ধনবিহীন ফোন দেশে ব্যবহার করা যাবে না, যা বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাবে।
‘লাগেজ পার্টি’ ও রিফার্বিশড ফোনের প্রতারণা এমআইওবি’র পক্ষ থেকে বলা হয়, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী—যাদেরকে “লাগেজ পার্টি” বলা হয়—এনইআইআর–এর বিরুদ্ধে বিভ্রান্তি ও ভয় ছড়ানোর চেষ্টা করছে। এমআইওবি’র অভিযোগ, এদের মাধ্যমেই দেশে চোরাই, নকল, কপি ও রিফার্বিশড (পুরোনো ফোনকে নতুন মোড়কে) হ্যান্ডসেটের ব্যবসা গড়ে উঠেছে।
ক্রেতারা কেন ‘গ্রে’ মার্কেটের ফোন কেনেন, তার ব্যাখ্যায় সংগঠনটি বলেছে, এসব পণ্য শুল্ক ও কর ফাঁকি দিয়ে দেশে প্রবেশ করে, ফলে দাম কম মনে হলেও গ্রাহকরা আসলে পাচ্ছেন নিম্নমানের ও অনিরাপদ পণ্য।
এমআইওবি’র মতে, এসব অবৈধ পণ্যে ওয়ারেন্টি সেবা, সফটওয়্যার সাপোর্ট বা হারানো ফোন ট্র্যাক করার সুবিধা থাকে না, যা সরাসরি ভোক্তা অধিকারের লঙ্ঘন। অবৈধ ফোনে প্রায়ই ম্যালওয়্যার ও ডেটা চুরির ঝুঁকি থাকে।
দাম কমানোর চেষ্টা দেশীয় উৎপাদকদের দেশীয় উৎপাদিত পণ্যের দাম ও মান প্রসঙ্গে এমআইওবি জানায়, গত দুই বছরে ডলার ও মোবাইল উপকরণের দাম প্রায় ৬০% বৃদ্ধি পেলেও, স্থানীয় উৎপাদকরা খরচ নিয়ন্ত্রণে রেখে ফোনের দাম বাড়াননি। ব্যাংক ঋণ রিশিডিউল, মার্কেটিং বাজেট কমানো এবং অন্যান্য উৎপাদন খরচে উৎকর্ষতা এনে দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।
অবৈধ স্টক নিবন্ধনের প্রস্তাব তবে, এরই মধ্যে যেসব আমদানিকারকের কাছে বিটিআরসি’র অনুমোদন (এনওসি) ছাড়া পণ্য মজুত রয়েছে, তাদের জন্য একটি সমাধানের প্রস্তাবও দিয়েছে এমআইওবি।
সংগঠনটি পরামর্শ দিয়েছে, এই আমদানিকারকরা যেন তাদের ক্রয়কৃত পণ্যের রশিদ ও ট্রেড লাইসেন্সসহ পণ্যের IMEI-এর একটি তালিকা আগামী ২০ নভেম্বরের মধ্যে বিটিআরসি’র কাছে জমা দেন। এমআইওবি বিটিআরসি’র কাছে এই স্টকগুলো এনইআইআর ডাটাবেইজে আপলোড করে নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাবে এবং পরবর্তীতে তাদের দ্রুত ভেন্ডর লাইসেন্স প্রদানে সহায়তা করবে।
এমআইওবি মনে করে, বিগত সময়ে বিভিন্ন উদ্যোগে নিবন্ধনবিহীন ফোন বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হলেও তা সফল হয়নি। তবে এবার বিটিআরসি–র উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে এবং এটি দেশের মোবাইল শিল্পের জন্য একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। তাই গুজব ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণায় কান না দিয়ে ন্যায্য বাজার ব্যবস্থার পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।





















