দেশের স্মার্টফোনের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে এক ভয়াবহ পাচার সিন্ডিকেট। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ‘লাগেজ পার্টি’র মাধ্যমে দেশে ঢুকছে হাজার হাজার কোটি টাকার ‘আনঅফিসিয়াল’ হ্যান্ডসেট। এই চক্রের সঙ্গে ‘ড্যাজল’ (Dazzle)-এর মতো সুপরিচিত প্রতিষ্ঠানও জড়িত বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
বসুন্ধরা সিটি শপিং মল এবং যমুনা ফিউচার পার্কের মতো প্রধান প্রযুক্তি বাজারে অবস্থান করা ‘ড্যাজল’ সহ এই সংগঠিত চক্রটি বছরে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যের স্মার্টফোন অবৈধভাবে দেশে আনছে। এর ফলে সরকার শুধু বিপুল রাজস্বই হারাচ্ছে না, হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হচ্ছে ডলার, যা দেশের অর্থনীতিকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
শুল্ক ফাঁকি থেকে ডলার পাচার শুল্ক আইন অনুযায়ী, প্রবাসীরা দেশে ফেরার সময় ব্যক্তিগত ব্যবহার্য পণ্য হিসেবে সীমিত সংখ্যক ফোন আনতে পারেন। এই ব্যাগেজ সুবিধাকেই অপব্যবহার করে ‘লাগেজ পার্টি’ সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তারা প্রবাসীদের ব্যাগেজে শত শত স্মার্টফোন এনে অবৈধভাবে বাজারজাত করছে।

তবে শুল্ক ফাঁকির চেয়েও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে ডলার পাচার। অভিযোগ, ‘অ্যাপল গ্যাজেট’ (Apple Gadget)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও এই কৌশলের সঙ্গে যুক্ত। তারা অবৈধভাবে আনা ফোন দেশের বাজারে নগদ টাকায় বিক্রি করে, সেই অর্থ হুন্ডি বা অন্যান্য অবৈধ চ্যানেলে বিদেশে পাচার করছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে মারাত্মক চাপ তৈরি করছে।
ধ্বংসের মুখে দেশীয় শিল্প, ঝুঁকিতে গ্রাহক ‘গ্রে-মার্কেট’-এর এই রমরমা বাণিজ্যের সরাসরি শিকার হচ্ছে দেশীয় মোবাইল উৎপাদন শিল্প। বৈধ আমদানিকারকরা যেখানে ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক-ভ্যাট পরিশোধ করে ফোন আমদানি করেন, সেখানে ‘গ্রে’ সিন্ডিকেট বিনা শুল্কে কম দামে ফোন বিক্রি করে বাজার দখল করছে।
বাংলাদেশ মোবাইল ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (MIOB)-এর প্রেসিডেন্ট জাকারিয়া শাহিদ বলেন, “অবৈধ পথে বিপুল সংখ্যক স্মার্টফোন দেশে প্রবেশ করায় দেশীয় হ্যান্ডসেট উৎপাদন শিল্প মারাত্মক চাপে পড়েছে। বর্তমানে বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ দখল করে নিয়েছে এই অবৈধ ফোন, যা দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রি কমিয়ে দিচ্ছে এবং বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে।”
জাকারিয়া শাহিদ আরও জানান, “অবৈধভাবে আসা ব্র্যান্ডগুলোর বেশিরভাগই নিম্নমানের—যার মধ্যে রয়েছে ব্র্যান্ডের কপি, নকল পণ্য ও রিফারবিশড ফোন। এসব নিম্নমানের ডিভাইস থেকে নির্গত রেডিয়েশনও স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি, যা গ্রাহকরা বুঝতে পারছেন না।”
দায়ী বিটিআরসি-এনবিআরের দুর্নীতি? তবে এই সিন্ডিকেটের উত্থানের পেছনে সরাসরি নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দায়ী করেছেন বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন-এর সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, “বিটিআরসি এবং এনবিআর-এর দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কারণেই মূলত অবৈধ হ্যান্ডসেটের আমদানি বেড়েছে। পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদনের পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের হাতের নাগালের বাইরে। যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ ও দেশের জনগণ।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরগুলোতে কাস্টমসের নজরদারি অবিলম্বে জোরদার করা না গেলে এই অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ বন্ধ করা সম্ভব হবে না।





















