রাজধানীর অভিজাত শপিং মল ইস্টার্ন প্লাজার সপ্তম তলায় গড়ে তোলা হয়েছিল মোবাইল ফোনের এক গোপন ‘মিনি ফ্যাক্টরি’। সেখানে বসে নামিদামি ব্র্যান্ডের হুবহু নকল ফোন তৈরি করছিল এমন এক চক্র, যাদের কারিগরদের শিক্ষাগত যোগ্যতা মাত্র ৫ম থেকে ৮ম শ্রেণি!
এই চক্রটি চোরাই ফোনের যন্ত্রাংশ এবং বিদেশ থেকে আনা নিম্নমানের পার্টস জোড়াতালি দিয়ে আইফোন, ভিভো, অপো, রিয়েলমি ও রেডমির মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের ফোন তৈরি করে আসছিল। সাধারণ চোখে আসল ও নকলের পার্থক্য বোঝা প্রায় অসম্ভব।
গত বছর এক অভিযানে পুলিশ এই কারখানার সন্ধান পায় এবং চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৩১৭টি প্রস্তুতকৃত নকল ফোন এবং আরও হাজারখানেক ফোন তৈরির যন্ত্রাংশ জব্দ করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—মো. আল আমিন হোসেন (২৪), মো. শিমুল (১৯) ও মো. রাসেল (৩১)।
স্বল্প শিক্ষিত হলেও প্রযুক্তিতে তারা এতটাই দক্ষ হয়ে উঠেছে যে, অরিজিনাল ফোনের অপারেটিং সিস্টেম (OS) ক্লোন করা থেকে শুরু করে হার্ডওয়্যার অ্যাসেম্বলিং—সবই তারা নিখুঁতভাবে করতে পারে। তাদের তৈরি ফোন বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে দেখতে হুবহু আসলের মতো।
তৈরির প্রক্রিয়া ও বাজারজাতকরণ জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, চক্রটি দুই উপায়ে যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করত:
১. বিভিন্ন চোরাই ফোনের ভালো যন্ত্রাংশ খুলে নেওয়া।
২. বিদেশ থেকে (লাগেজ পার্টির মাধ্যমে) অত্যন্ত নিম্নমানের যন্ত্রাংশ আমদানি করা।
ইস্টার্ন প্লাজার ওই গোপন কারখানায় বসে তারা মাদারবোর্ড সেটিং, ডিসপ্লে লাগানো এবং ভুয়া আইএমইআই (IMEI) স্টিকার তৈরির কাজ করত। এরপর হুবহু আসলের মতো দেখতে বক্সে প্যাকেটজাত করে তা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠানো হতো রাজধানীর মোতালেব প্লাজা, নাহার প্লাজা এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায়।
‘সেকেন্ড হ্যান্ড’ বলে প্রতারণা খুচরা বিক্রেতারা এই ফোনগুলো ‘সেকেন্ড হ্যান্ড’ বা ‘ইউজড’ ফোন হিসেবে নির্ধারিত মূল্যের অর্ধেক দামে সাধারণ ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করত। দেখতে চকচকে এবং অরিজিনাল অপারেটিং সিস্টেম থাকায় ক্রেতারা সহজেই এই ফাঁদে পা দিতেন।
এনইআইআর (NEIR) চালুর গুরুত্ব বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইস্টার্ন প্লাজার এই ঘটনা প্রমাণ করে যে দেশের মোবাইল বাজার কতটা অরক্ষিত। ১৬ ডিসেম্বর থেকে এনইআইআর (NEIR) চালু হলে বিটিআরসি’র ডাটাবেজে না থাকা এসব নকল আইএমইআই-যুক্ত ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। এতে করে স্বল্প শিক্ষিত কারিগরদের এই ‘মিনি ফ্যাক্টরি’ এবং ২০ হাজার কোটি টাকার অবৈধ ফোনের বাজার চিরতরে বন্ধ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।






















