বাংলাদেশে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালুর ঘোষণা নিয়ে একটি মহল বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করলেও, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই প্রযুক্তি মোটেও নতুন কোনো ধারণা নয়। চুরি, চোরাচালান, কর ফাঁকি এবং অবৈধ ‘গ্রে মার্কেট’ ঠেকাতে বিশ্বের বহু দেশ বহু বছর ধরেই এই প্রযুক্তি সফলভাবে ব্যবহার করছে।
ভারত, পাকিস্তান, নেপাল থেকে শুরু করে তুরস্ক ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলোতে এই সিস্টেম (কোথাও CEIR, কোথাও DIRBS বা MDMS নামে পরিচিত) জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। অথচ বাংলাদেশে আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে এই পরীক্ষিত ব্যবস্থাটি চালুর আগে অবৈধ আমদানিকারক ও চোরাচালান চক্র নানা অজুহাতে বাধার সৃষ্টি করছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় কঠোর ও সফল বাস্তবায়ন বিশ্লেষকরা বলছেন, এনইআইআর কোনো স্থানীয় পরীক্ষামূলক ধারণা নয়। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতেই এর সফল নজির রয়েছে।
-
ভারত: ২০১৯ সালে ‘সিইআইআর’ (CEIR) নামে কেন্দ্রীয় ডিভাইস রেজিস্ট্রি চালু করে ভারত। এর ফলে দেশটিতে চুরিকৃত হ্যান্ডসেট পুনরায় সক্রিয় করার সুযোগ প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।
-
পাকিস্তান: ‘ডিআইআরবিএস’ (DIRBS) চালু করার পর পাকিস্তানে অবৈধ ফোনের ব্যবহার ৩০ শতাংশের বেশি কমেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটি মোবাইল মার্কেট থেকে বছরে কয়েক হাজার কোটি রুপি বাড়তি রাজস্ব পাচ্ছে।
-
নেপাল: ‘এমডিএমএস’ (MDMS) চালুর পর বিদেশ থেকে আনা অনিবন্ধিত নতুন সেট নেপালের নেটওয়ার্কে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। এতে দেশটির স্থানীয় ডিস্ট্রিবিউশন চেইন শক্তিশালী হয়েছে।
ইউরোপ-আমেরিকাতেও সক্রিয় নজরদারি শুধু এশিয়া নয়, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকাতেও ডিভাইস ব্লকিং সিস্টেম সক্রিয় রয়েছে।
-
তুরস্ক: আইএমইআই (IMEI) রেজিস্ট্রেশন সেখানে বাধ্যতামূলক এবং বিদেশি ফোনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ট্যাক্স আরোপ করা হয়।
-
ব্রাজিল: ‘সিইএমআই’ (CEMI) ডাটাবেজে ব্ল্যাকলিস্টেড বা কালো তালিকাভুক্ত কোনো ফোন ব্রাজিলের নেটওয়ার্কে চলে না।
-
অন্যান্য: কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা ও চিলিতে রেজিস্ট্রেশন ছাড়া ডিভাইস অকার্যকর হয়ে যায়। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে চুরি হওয়া ডিভাইস আটকাতে ‘ক্রস-বর্ডার ব্লকিং’ ব্যবস্থা চালু আছে।
বাংলাদেশে কেন প্রয়োজন? বাংলাদেশে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক ফোন চোরাচালানের মাধ্যমে বা ‘লাগেজ পার্টি’র মাধ্যমে বাজারে প্রবেশ করে। সরকার ও খাতসংশ্লিষ্টদের হিসেব অনুযায়ী, শুধু ‘গ্রে মার্কেটের’ কারণে রাষ্ট্র বছরে হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারায়। এছাড়া আইএমইআই ডাটাবেজ না থাকায় চুরি হওয়া ফোন উদ্ধার করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এনইআইআর চালু হলে তিনটি বড় পরিবর্তন আসবে: ১. অবৈধ চ্যানেলে আসা নতুন ফোন নেটওয়ার্কে সচল হবে না। ২. চুরি হওয়া ডিভাইস তৎক্ষণাৎ ব্লক করা যাবে, ফলে চুরির প্রবণতা কমবে। ৩. বৈধ উৎপাদনকারী ব্র্যান্ডগুলো বিনিয়োগ বাড়াতে উৎসাহ পাবে এবং সরকারের রাজস্ব বাড়বে।
সরকার বারবার আশ্বস্ত করেছে যে, বর্তমানে সাধারণ মানুষের হাতে থাকা কোনো ফোন বন্ধ হবে না, শুধু ১৬ ডিসেম্বরের পর নতুন আসা অবৈধ সেটগুলো নেটওয়ার্কে সক্রিয় হবে না।
সিন্ডিকেটের অপপ্রচার বনাম বাস্তবতা চোরাচালান চক্র ও অবৈধ ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, এই সিস্টেম চালু হলে “বাজার ছোট হবে এবং আমদানি বাধাগ্রস্ত হবে।”
তবে প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, মূল সমস্যা প্রযুক্তি নয়, সমস্যা হলো বিদ্যমান অবৈধ ব্যবসায়িক স্বার্থের সংঘাত। এক জ্যেষ্ঠ প্রযুক্তি বিশ্লেষক বলেন, “যে দেশে নিজস্ব উৎপাদন শিল্প আছে, সেখানে গ্রে মার্কেটকে বৈধতা দেওয়া মানে দেশীয় বিনিয়োগ ধ্বংস করা। এনইআইআর আন্তর্জাতিকভাবে পরীক্ষিত একটি মডেল, এটি নিয়ে বিতর্কের সুযোগ নেই।”
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ সিস্টেমটি সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য বিশেষজ্ঞরা কিছু সুপারিশ করেছেন:
-
ভোক্তারা যাতে এসএমএস বা অ্যাপের মাধ্যমে সহজে ডিভাইস যাচাই করতে পারেন, তার ব্যবস্থা করা।
-
পুরোনো ব্যবহারকারীদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ‘হোয়াইটলিস্ট’ সাপোর্ট নিশ্চিত করা।
-
আইনি প্রক্রিয়ায় চোরাচালান রোধে কাস্টমস ও টেলিকম খাতের সমন্বয়।
-
অপপ্রচার রোধে স্বচ্ছ তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা।






















