একটা সময় ছিল যখন স্মার্টফোন মানেই ছিল ‘মেড ইন চায়না’। কিন্তু ভূ-রাজনীতি, শ্রমবাজার এবং কর কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোন শিল্পের মানচিত্র বদলাতে শুরু করেছে। বর্তমানে এটি একটি বহু দেশভিত্তিক বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে পরিণত হয়েছে।
এই দৌড়ে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকলেও ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়ার মতো এশিয়ার দেশগুলোর পাশাপাশি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে নিচ্ছে বাংলাদেশও।
চীনে এখনও বিশ্বের ৬০% উৎপাদন বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্মার্টফোন উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে এখনও শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে চীন। অ্যাপল, শাওমি, হুয়াওয়ে, অপো, ভিভো এবং লেনোভোসহ প্রায় সব বড় ব্র্যান্ডের প্রধান কারখানা বা অ্যাসেম্বলি লাইন সেখানেই অবস্থিত। বিশ্বের মোট স্মার্টফোনের ৬০ শতাংশেরও বেশি তৈরি হয় দেশটিতে। শুধু অ্যাসেম্বলি নয়; ডিসপ্লে, ব্যাটারি ও ক্যামেরা সেন্সরের মতো গুরুত্বপূর্ণ কম্পোনেন্ট তৈরির হাবও চীন।
ভারত এখন দ্বিতীয় বৃহৎ শক্তি ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ নীতির সফল বাস্তবায়নের ফলে স্মার্টফোন উৎপাদনে চীনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রস্তুতকারী দেশে পরিণত হয়েছে ভারত। দেশটিতে অ্যাপল (ফক্সকন, উইস্ট্রন), স্যামসাং, শাওমি, ভিভো ও অপোর মতো জায়ান্টরা বিশাল বিনিয়োগ করেছে। শুধু অ্যাপলই ভারত থেকে বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলারের আইফোন রপ্তানি করছে। এছাড়া লাভা ও মাইক্রোম্যাক্সের মতো স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোও সেখানে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
ভিয়েতনাম: স্যামসাংয়ের গ্লোবাল হাব স্মার্টফোন রপ্তানির ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম এখন বিশ্বের অন্যতম বড় কেন্দ্র। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ান জায়ান্ট স্যামসাং তাদের বৈশ্বিক উৎপাদনের একটি বিশাল অংশ ভিয়েতনামের কারখানাগুলো থেকে পরিচালনা করে। পাশাপাশি শাওমিসহ আরও কিছু ব্র্যান্ড সেখানে তাদের অ্যাসেম্বলি লাইন চালু করেছে।
তালিকায় উঠে আসছে বাংলাদেশ স্মার্টফোন উৎপাদনের বৈশ্বিক মানচিত্রে বাংলাদেশ এখন আর পিছিয়ে নেই। অনুকূল কর কাঠামো এবং শ্রম ব্যয়ের সুবিধা কাজে লাগিয়ে স্যামসাং, শাওমি, ভিভো, টেকনো, ইনফিনিক্স এবং সিম্ফনির মতো আন্তর্জাতিক ও দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশে নিজস্ব কারখানা স্থাপন করেছে। ওয়ালটনের মতো দেশীয় প্রতিষ্ঠানও পুরোদমে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি নীতি সহায়তা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’-এ পরিণত হতে পারে। এমনকি আইফোন উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়েও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ যদি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে মনোযোগ দিতে চায়, তিনটি পদক্ষেপ জরুরি—
অবৈধ আমদানি দমন, রপ্তানিমুখী কর সুবিধা ও গবেষণা–চিপ–সফটওয়্যার খাতে বিনিয়োগ। বাংলাদেশ এখনও উৎপাদনের প্রান্তে; নীতি ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি জোরদার হলে এগিয়ে যাওয়ার বড় সুযোগ রয়েছে।
প্রযুক্তি ও ডিজাইনে এগিয়ে কারা? উৎপাদনে এশিয়া এগিয়ে থাকলেও প্রযুক্তি ও গবেষণায় (R&D) নেতৃত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান। অ্যাপল ও গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানের গবেষণা হয় যুক্তরাষ্ট্রে। অন্যদিকে সনি, শার্প এবং স্যামসাংয়ের প্রিমিয়াম ডিভাইসগুলোর ডিজাইন ও কম্পোনেন্ট উন্নয়ন হয় জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায়।
এছাড়া উচ্চ আমদানী শুল্ক এড়াতে ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোতেও স্থানীয় বাজারের জন্য মটোরোলা ও স্যামসাংয়ের মতো ব্র্যান্ডগুলো অ্যাসেম্বলি কার্যক্রম বৃদ্ধি করেছে।






















