২০২১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যখন মোবাইল ফোন নিবন্ধনে এনইআইআর (NEIR) বা ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার উদ্যোগ নিয়েছিল, তখন তিনি ছিলেন এর কট্টর সমর্থক। যুক্তি দিয়েছিলেন—‘এতে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরবে’। অথচ ২০২৫ সালে এসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন সেই একই উদ্যোগ বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তখন তিনি ভোল পাল্টে এর ঘোর বিরোধিতা করছেন। শুধু বিরোধিতাই নয়, আগামী ২৫ তারিখ বাজার বন্ধের ‘হুঙ্কার’ দিয়ে সরকারকে অস্থিতিশীল করার হুমকিও দিচ্ছেন তিনি।
তিনি হলেন চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নেতা আরিফুর রহমান। অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এই ব্যবসায়ী নেতা ৫ আগস্টের পর রাতারাতি নিজেকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ দাবি করে অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের আমলে স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের আশীর্বাদ এবং প্রশাসনের একাংশকে ম্যানেজ করে তিনি চট্টগ্রাম মেট্রো মোবাইল ব্যবসায়ী সমিতি এবং তমাকুণ্ড লাইন মোবাইল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতির পদ দখল করেন।
২১-এ সমর্থন, ২৫-এ বিরোধিতা: নেপথ্যে কী?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আরিফুর রহমান চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারের রিজওয়ান কমপ্লেক্সের ‘আমিন স্টোর’-এর স্বত্ত্বাধিকারী। একইসঙ্গে তিনি তমাকুণ্ড লাইন মোবাইল ব্যবসায়ী সমিতি এবং চট্টগ্রাম মেট্রো মোবাইল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি।

সাধারণ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ২০২১ সালে এনইআইআর সমর্থন করলেও এখন তার বিরোধিতার মূল কারণ রাজনৈতিক ও অবৈধ ব্যবসায়িক স্বার্থ। মূলত ফেব্রুয়ারি মাসে সম্ভাব্য নির্বাচনকে সামনে রেখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বেকায়দায় ফেলা এবং দেশে ‘ব্যবসায়িক অস্থিতিশীলতা’ তৈরি করাই তার মূল লক্ষ্য। এনইআইআর বিরোধিতার আড়ালে তিনি সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
‘জুলাই যোদ্ধা’র মুখোশে আ.লীগের চক্রান্ত
রিয়াজউদ্দিন বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আরিফুর রহমান দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সুবিধাভোগী ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার প্রমাণও রয়েছে। অথচ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি এখন ‘জুলাই বিপ্লবের যোদ্ধা’র মুখোশ পরেছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি একটি সুগভীর চক্রান্ত। একদিকে তিনি সরকারের সমর্থক সেজে আছেন, অন্যদিকে ২৫ তারিখ বাজার বন্ধের ডাক দিয়ে সরকারকে অজনপ্রিয় করার চেষ্টা করছেন। তার এই ‘বন্ধের হুঙ্কার’ মূলত চট্টগ্রাম বন্দর ও সীমান্ত দিয়ে আসা অবৈধ ও চোরাই ফোনের ২০ হাজার কোটি টাকার ‘গ্রে-মাফিয়া’ সিন্ডিকেট রক্ষা করারই কৌশল। 
এই চক্রান্তের অংশ হিসেবে আরিফুর রহমান সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে টার্গেট করেছেন। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) ফয়েজ আহমদ তৈয়ব-কে নিয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধারাবাহিক মিথ্যাচার ও অপপ্রচার চালিয়েছেন। এমনকি তার পদত্যাগের দাবিতেও সোচ্চার ছিলেন এই আওয়ামী পন্থী ব্যবসায়ী।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ফয়েজ তৈয়ব এনইআইআর বাস্তবায়নে কঠোর অবস্থানে থাকায় সিন্ডিকেটের স্বার্থে আঘাত লেগেছে, যার ফলে আরিফুর রহমান ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে এই অপপ্রচার চালাচ্ছেন।

আরিফুর রহমানের মতো নেতারা এনইআইআর ইস্যুতে সাধারণ ব্যবসায়ীদের ভুল বুঝিয়ে রাস্তায় নামানোর চেষ্টা করছেন। ২০২১ সালে যা ‘ভালো’ ছিল, ২০২৫ সালে তা কেন ‘খারাপ’ হলো—এই প্রশ্নের সদুত্তর তিনি দিতে পারছেন না।
আইসিটি মন্ত্রণালয় এবং বিটিআরসি ইতিমধ্যে স্পষ্ট করেছে যে, এনইআইআর বাস্তবায়ন থেকে সরকার পিছু হটবে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, আরিফুর রহমানের মতো ‘দ্বিমুখী’ নেতারা যদি ২৫ তারিখ সত্যিই বাজার অচল করার চেষ্টা করেন বা রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।





















