দেশে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) বা মোবাইল ফোন নিবন্ধন প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি এখন আর কোনো সাধারণ প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; বরং দেশের অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং জনস্বার্থ রক্ষার জন্য এটি ‘অপরিহার্য’ বা ‘জরুরি’ হয়ে পড়েছে।
কেন এই মুহূর্তে এনইআইআর বাস্তবায়ন জরুরি, তার পেছনে ৫টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
১. গ্রাহকের জীবন রক্ষা দেশের অবৈধ মোবাইল বাজারের প্রায় ৭৫ শতাংশই এখন ‘রিফারবিশড’ বা ‘ক্লোন’ ফোনের দখলে। চীন বা দুবাই থেকে আনা ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা পুরোনো ফোন নতুনের মোড়কে বিক্রি করা হচ্ছে। সম্প্রতি ‘পোকো এফ৬’ (Poco F6) বিস্ফোরণের ঘটনা প্রমাণ করেছে, নিম্নমানের ব্যাটারি ও যন্ত্রাংশযুক্ত এসব ফোন গ্রাহকের জন্য ‘টাইম বোমা’র মতো। এনইআইআর চালু হলে বিটিআরসির ডাটাবেজে না থাকা এসব ঝুঁকিপূর্ণ ফোন নেটওয়ার্কে সচল হতে পারবে না, ফলে গ্রাহক প্রতারণা ও মৃত্যুঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবেন।
২. ১০,০০০ কোটি টাকার ডলার পাচার রোধ মোবাইল ফোনের ‘গ্রে-মার্কেট’ বা অবৈধ বাজার মূলত হুন্ডি ও মানিলন্ডারিংয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই অবৈধ বাণিজ্যের আড়ালে বছরে ১০,০০০ কোটি টাকার বেশি ডলার বিদেশে পাচার হচ্ছে। দেশের বর্তমান ডলার সংকটের সময়ে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার রোধ করতে এনইআইআর-এর কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
৩. জাতীয় নিরাপত্তা ও অপরাধ দমন নিবন্ধনহীন বা ভুয়া আইএমইআই (IMEI) যুক্ত ফোন অপরাধীদের প্রধান হাতিয়ার। সন্ত্রাসীরা পরিচয় গোপন করতে এবং অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসায় এসব ফোন ব্যবহার করে। এনইআইআর চালু হলে প্রতিটি ফোন ব্যবহারকারীর পরিচয় নিশ্চিত করা যাবে। ফলে অপরাধী শনাক্তকরণ সহজ হবে এবং জাতীয় নিরাপত্তা সুসংহত হবে।
৪. দেশীয় শিল্প ও লাখো কর্মসংস্থান রক্ষা বাংলাদেশে স্যামসাং, শাওমি, ভিভোসহ ১৭টি মোবাইল কারখানা গড়ে উঠেছে, যেখানে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ও লাখো মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। কিন্তু বাজারের ৬০ শতাংশ অবৈধ ফোনের দখলে থাকায় এই বৈধ শিল্প রুগ্ন হয়ে পড়ছে। দেশীয় শিল্প বাঁচাতে এবং সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে অবৈধ ফোনের রাস্তা বন্ধ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
৫. ৫ সেকেন্ডে আইএমইআই বদল ও চুরি রোধ মোতালেব প্লাজার মতো কিছু মার্কেটে অসাধু চক্র ‘দঙ্গল’ ডিভাইসের মাধ্যমে মাত্র ৫ সেকেন্ডে ফোনের আইএমইআই বদলে ফেলছে। ফলে জিডি করেও চুরি হওয়া ফোন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এনইআইআর চালু হলে চুরি যাওয়া ফোনটি সার্ভার থেকে লক করে দেওয়া যাবে, ফলে ফোনটি ‘খেলনা’ বা অকেজো হয়ে যাবে। এতে মোবাইল চুরির প্রবণতা ৯০ শতাংশ কমে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যারা বর্তমানে এনইআইআর-এর বিরোধিতা করছে বা ‘দেশ অস্থিতিশীল’ করার হুমকি দিচ্ছে, তারা মূলত এই ২০ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সিন্ডিকেট ও মানিলন্ডারিং চক্রের অংশ। রাষ্ট্র, অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থেই এনইআইআর বাস্তবায়ন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।





















