চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজার এখন চোরাই ও অবৈধ মোবাইলের ‘স্বর্গরাজ্য’ বা ‘সেফ জোন’-এ পরিণত হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে চুরি বা ছিনতাই হওয়া আইফোনসহ দামি স্মার্টফোনগুলো দেদারসে বিক্রি হচ্ছে এখানকার তামাকুমুণ্ডি লেন ও জলসা মার্কেটে।
চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারে হাত বাড়ালে সহজেই মিলছে চোরাই ও অবৈধপথে আনা মোবাইল ফোন। বাজারের বিভিন্ন ফুটপাত, গলির দোকান আর ইলেকট্রনিক্স শোরুমের আড়ালে চলছে এসব মোবাইল ফোনের অবাধ বেচাকেনা। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চোরা কারবারিদের ঠেকাতে জোর নজরদারি নেই, যেন দেখেও দেখে না ‘প্রশাসন’।
অভিযোগ উঠেছে, ২০ হাজার কোটি টাকার এই অবৈধ বাণিজ্যের নেপথ্য মদদদাতা বা ‘শেল্টারদাতা’ হলেন তমাকুণ্ড লাইন মোবাইল ব্যবসায়ী সমিতি এবং চট্টগ্রাম মেট্রো মোবাইল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আরিফুর রহমান। আওয়ামী লীগ পন্থী এই নেতার ছত্রছায়ায় রাশেদের মতো ১৫-২০ জন চোরাকারবারির একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এখানে গড়ে উঠেছে।
আওয়ামী সরকার পতনের পর আরিফুর রহমানকে দেখা না গেলেও বাংলাদেশ অবৈধ মোবাইল বিজনেস কমিউনিটির আন্দোলনে নামারও ঘোষণা দিলে তাকে প্রকাশ্যে আসতে দেখা যায় ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চোরাই ফোনের এই রমরমা ব্যবসার মূল কারণ অবিশ্বাস্য মুনাফা। রিয়াজউদ্দিন বাজারের এক ব্যবসায়ী জানান, একটি আইফোন ১৫ প্রো ম্যাক্স-এর বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় দেড় লাখ টাকা। অথচ ভারতের চোরাকারবারিরা চুরি করা এই ফোনটি মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেয়।

সীমান্ত পার করতে দালালদের দিতে হয় ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে ৪০-৪৫ হাজার টাকা খরচে আসা ফোনটি রিয়াজউদ্দিন বাজারের দোকানে বিক্রি হয় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকায়। অর্থাৎ প্রতিটি ফোনেই বিক্রেতার লাভ থাকে ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। ক্রেতারাও অর্ধেক দামে পেয়ে কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই এসব ফোন কিনছেন।
এই বাজারের চোরাই ফোন ব্যবসার অন্যতম মূল হোতা মো. রাশেদ। সাতকানিয়ার কাঞ্চনা ইউনিয়নের বাসিন্দা রাশেদ একসময় দুবাই প্রবাসী ছিলেন। সেখানে সুবিধা করতে না পেরে দেশে ফিরে রিয়াজউদ্দিন বাজারে সাধারণ বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর জড়িয়ে পড়েন চোরাচালানে।
বর্তমানে রিয়াজউদ্দিন বাজারের মোহাম্মদীয়া প্লাজায় ‘মিশমা টেলিকম’ নামে তার দোকান রয়েছে। রাশেদ ও তার ভাই কায়সার মিলে ভারত থেকে চোরাই ফোন এনে সারা দেশে সাপ্লাই দেন। আবার বাংলাদেশ থেকে চুরি হওয়া ফোনগুলো কায়সারের মাধ্যমে দুবাই হয়ে ওমানে পাচার করেন।

রাশেদের বিরুদ্ধে গত বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি শাহজালাল বিমানবন্দরে ২২টি দামি ফোন ও মদসহ আটক হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। এছাড়া ভারতীয় এক পুলিশ কর্মকর্তার মেয়ের ফোন চুরির ঘটনায় তিনি ভারতের বেনাপোল সীমান্তে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন।
সম্প্রতি ভারতীয় তরুণী দীপান্বিতা সরকারের চুরি হওয়া আইফোন ১৪ প্লাস রিয়াজউদ্দিন বাজার থেকে উদ্ধারের ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এই ঘটনায় গত ৩১ মে তারেক ও হেলাল নামের দুই চোরাকারবারিকে আটক করেছিল ডিবি।
অভিযোগ রয়েছে, আরিফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা ডিবির সঙ্গে মধ্যস্থতা করেন। এরপর রহস্যজনকভাবে ওই দুই আসামিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এমনকি জলসা মার্কেটের যে রুবেলের দোকান থেকে ফোনটি উদ্ধার হয়েছিল, তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী জানান, আরিফুর রহমান তার ‘আওয়ামী কানেকশন’ এবং প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে এই সিন্ডিকেট টিকিয়ে রেখেছেন। তিনি নিজেকে এখন ‘জুলাই যোদ্ধা’ দাবি করলেও মূলত তিনি এই মাফিয়া চক্রের প্রধান রক্ষাকবচ।






















