দেশে প্রতি বছর গড়ে ২ লাখ মোবাইল ফোন চুরি হচ্ছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১০০ কোটি বা ১ বিলিয়ন টাকা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আসা অভিযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) এই ভয়াবহ তথ্য জানিয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চুরির প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। কারণ, ঝামেলা এড়াতে অনেক ভুক্তভোগীই থানায় অভিযোগ করেন না। যারা অভিযোগ করেন, তাদেরও অধিকাংশ ফোন ফিরে পান না। কারণ, চুরির পরপরই সিন্ডিকেট চক্র ফোনের যন্ত্রাংশ খুলে ফেলে অথবা আইএমইআই (IMEI) বদলে ফেলে।
সিন্ডিকেটের কবলে চোরাই ফোন
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীতে মোবাইল চোরদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। চুরির পর ফোনগুলো তাদের হাতে চলে যায়।
১. যন্ত্রাংশ বিক্রি: সিন্ডিকেট দ্রুতগতিতে ফোনের ডিসপ্লে, ব্যাটারি ও মাদারবোর্ড খুলে ফেলে এবং তা দেশের বিভিন্ন মোবাইল মেরামতকারী দোকানে বিক্রি করে দেয়।
২. বিদেশে পাচার: দামি আইফোন বা ফ্ল্যাগশিপ ফোনগুলো প্রতিবেশী দেশ ভারত, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে পাচার করা হয়। একইভাবে ভারত থেকে চুরি হওয়া ফোনও বাংলাদেশের বাজারে ঢুকছে।
আইএমইআই বদলে ফেলা হচ্ছে ৫ সেকেন্ডে
গাজীপুর পূবাইল থানার সাবেক ওসি এবং বর্তমানে ডিএমপিতে কর্মরত এস এম আমিরুল ইসলাম বলেন, “পুলিশের কাছে আসা অভিযোগের মাত্র ৫০ শতাংশ ফোন উদ্ধার সম্ভব হয়। বাকিগুলো উদ্ধার করা যায় না কারণ চোর চক্র বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করে মাত্র ৩ থেকে ৫ সেকেন্ডের মধ্যে আইএমইআই নম্বর বদলে ফেলে।”
আইএমইআই বদলে ফেলায় ফোনের অবস্থান শনাক্ত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এছাড়া ফোন চুরি যাওয়ার পর ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে ভুক্তভোগীকে ব্ল্যাকমেইল করার ঘটনাও ঘটছে।
হুমকিতে ৪ হাজার কোটির দেশীয় শিল্প
২০১৭ সাল থেকে দেশে গড়ে ওঠা মোবাইল ফোন উৎপাদন শিল্প এখন অবৈধ ও চোরাই ফোনের কারণে হুমকির মুখে। দেশে বর্তমানে ১৭টি মোবাইল কারখানা রয়েছে, যেখানে আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছে। এর সঙ্গে প্যাকেজিং, ব্যাটারি ও চার্জার শিল্পে আরও দেড় হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। এই খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় দেড় লাখ মানুষ কাজ করছেন।
কিন্তু অবৈধ ফোনের দাপটে বৈধ কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়েছে এবং সরকার বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
১৬ ডিসেম্বর এনইআইআর: একমাত্র সমাধান
মোবাইল চুরি রোধ এবং অবৈধ ফোনের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে বিটিআরসি আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালুর ঘোষণা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এনইআইআর চালু হলে অবৈধভাবে আমদানি করা বা নিবন্ধনবিহীন ফোন দেশে আর চলবে না। চুরি হওয়া ফোন লক করে দেওয়া যাবে, ফলে চোরেরা আইএমইআই বদলালেও কোনো লাভ হবে না। এতে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরবে, সরকারের রাজস্ব বাড়বে এবং ভোক্তার অধিকার সুনিশ্চিত হবে।






















