বিশ্বব্যাপী মেমোরি-চিপের তীব্র সংকট প্রযুক্তি বিশ্বে এক নতুন যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং সাধারণ ইলেকট্রনিক্স কোম্পানিগুলোর মধ্যে চিপ সংগ্রহের এই লড়াইয়ে পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ। বিলিয়ন বিলিয়ন গ্রাহকের ডাটা সংরক্ষণের তাগিদে মাইক্রোসফট ও গুগলের মতো টেক জায়ান্টরা চড়া দামে চিপ কিনতে বাধ্য হচ্ছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোবাইল, ল্যাপটপ, বিদ্যুৎচালিত গাড়ি এবং ডাটা সেন্টারে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ মেমোরি-চিপ প্রয়োজন, তার যোগান দিতে গিয়ে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে।
দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে চিপ
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্রেন্ডফোর্স (TrendForce)-এর পরিসংখ্যান বলছে, মেমোরি চিপের বাজারদর এখন আকাশছোঁয়া। একসময় যে মেমোরি চিপের চালানের দাম ছিল ৫ লাখ ডলার, বর্তমানে একই চালান বিক্রি হচ্ছে ৯ লাখ ডলারে। কিছু কিছু সেগমেন্টে গত ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানায়, বাজারে ইউএসবি ড্রাইভ ও স্মার্টফোনে ব্যবহৃত সাধারণ ফ্ল্যাশ চিপ থেকে শুরু করে ডাটা সেন্টারের উন্নত হাই-ব্যান্ডউইথ মেমোরি (HBM)—সব ক্ষেত্রেই সংকট চরমে। বড় বড় টেক প্রতিষ্ঠানের বর্ধিত চাহিদার কারণে এই দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন গবেষকরা।
বড় কোম্পানিগুলোর দৌড়ঝাঁপ
সংকট মোকাবিলায় মাইক্রোসফট, গুগল, ওপেন এআই, এনভিডিয়া, আলিবাবা এবং বাইটড্যান্সের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টরা এখন মরিয়া। তারা সরবরাহ নিশ্চিত করতে মাইক্রন, স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স এবং এসকে হাইনিক্সের মতো খ্যাতনামা মেমোরি-চিপ নির্মাতাদের সঙ্গে নতুন নতুন চুক্তি করছে।
ভোক্তা পর্যায়ে প্রভাব: জাপান ও চীনের চিত্র
এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। জাপানে ইলেকট্রনিক্স দোকানগুলো ক্রেতাদের হার্ড-ডিস্ক কেনার ওপর সীমা আরোপ করেছে। অন্যদিকে, চীনের স্মার্টফোন নির্মাতারা মেমোরি-চিপের দাম বাড়ার কারণে খুব শীঘ্রই ডিভাইসের মূল্যবৃদ্ধির সতর্কতা জারি করেছে।
অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও বিশেষজ্ঞদের মত
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, মেমোরি-চিপের এই অভাব শুধু প্রযুক্তি খাত নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা দিতে পারে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে এআই-নির্ভর উৎপাদনশীলতা থমকে যেতে পারে এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ডিজিটাল অবকাঠামো প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া মার্কিন শুল্ক নীতির প্রভাবে অনেক দেশে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে।
প্রযুক্তি পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান গ্রেহাউন্ড রিসার্চ-এর সিইও সাঞ্চিত বির গোগিয়া বলেন, “মেমোরি সংকট এখন আর কেবল উৎপাদন স্তরের সমস্যা নয়, এটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। এআই নির্ভর অবকাঠামো তৈরির যে জোয়ার এসেছে, উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলো তার চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় গোটা সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইনই এখন ঝুঁকির মুখে।”
কেন এই সংকট?
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, উন্নত এআই মডেল তৈরির জন্য উচ্চমানের সেমিকন্ডাক্টর প্রয়োজন। চিপ নির্মাতারা এখন সাধারণ মেমোরি চিপের বদলে এআই চিপ তৈরিতেই বেশি জনবল ও বিনিয়োগ করছে। ফলে স্মার্টফোন, পিসি ও ভোক্তা ইলেকট্রনিক্সের জন্য সাধারণ মেমোরি চিপের সরবরাহ কমে যাচ্ছে এবং সংকট ঘনীভূত হচ্ছে।






















