দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে বাংলাদেশে শুরু হলো পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ৫-জি প্রযুক্তির যাত্রা। দেশের শীর্ষ বেসরকারি মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন ও রবি বাণিজ্যিকভাবে এবং সরকারি অপারেটর টেলিটক পরীক্ষামূলকভাবে ৫-জি সেবা চালু করেছে।
এর মধ্য দিয়ে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দ্রুতগতির ইন্টারনেট, অত্যন্ত কম লেটেন্সি এবং একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ডিভাইস সংযুক্ত করার সক্ষমতা—এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে ৫-জি প্রযুক্তিকে ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৫-জি কী?
৫-জি বা ফিফথ জেনারেশন হলো মোবাইল যোগাযোগ প্রযুক্তির পঞ্চম প্রজন্ম। এটি বর্তমান ৪-জি এলটিই নেটওয়ার্কের পরবর্তী ধাপ। প্রযুক্তিটি মূলত আরও দ্রুতগতির ডেটা আদান-প্রদান, তাৎক্ষণিক রেসপন্স এবং স্মার্ট ডিভাইসনির্ভর সংযুক্ত বিশ্ব গড়ে তোলার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫-জি শুধু মোবাইল ইন্টারনেটের গতি বাড়াবে না; বরং শিল্পকারখানা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পরিবহন ও নগর ব্যবস্থাপনাসহ প্রায় সব খাতেই বড় পরিবর্তন আনবে।
যেভাবে কাজ করে ৫-জি
৫-জি প্রযুক্তি একাধিক আধুনিক নেটওয়ার্ক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
সাব-৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ড
এই প্রযুক্তিতে ৬ গিগাহার্টজের নিচের ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে মূলত ৩.৫ গিগাহার্টজ ব্যান্ডে সেবা চালু হয়েছে। এটি তুলনামূলক বেশি কভারেজ দেয় এবং শহর ও গ্রামের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে।
মিলিমিটার ওয়েভ
২৪ থেকে ৩০০ গিগাহার্টজ পর্যন্ত উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির এই প্রযুক্তি বিপুল পরিমাণ ডেটা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে পরিবহন করতে পারে। তবে এর কভারেজ তুলনামূলক কম।
ম্যাসিভ এমআইএমও
একাধিক অ্যান্টেনা ব্যবহারের মাধ্যমে একই সময়ে বহু ব্যবহারকারীকে দ্রুতগতির সংযোগ দেওয়ার প্রযুক্তি এটি।
নেটওয়ার্ক স্লাইসিং
একই নেটওয়ার্ককে ভার্চুয়ালি ভাগ করে নির্দিষ্ট প্রয়োজনে আলাদা সক্ষমতা দেওয়া যায়। ফলে গেমিং, ভিডিও স্ট্রিমিং বা শিল্পকারখানার অটোমেশন—সব ক্ষেত্রেই আলাদা পারফরম্যান্স নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
৪-জি থেকে কতটা এগিয়ে ৫-জি?
ডাউনলোড স্পিড
তাত্ত্বিকভাবে ৫-জি নেটওয়ার্কে সর্বোচ্চ ২০ গিগাবিট পার সেকেন্ড (Gbps) পর্যন্ত ডাউনলোড গতি পাওয়া সম্ভব। যেখানে ৪-জির সর্বোচ্চ গতি সাধারণত ১ জিবিপিএসের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যবহারকারীরা গড়ে ১০০ থেকে ২২০ এমবিপিএস পর্যন্ত গতি পাচ্ছেন। কিছু ক্ষেত্রে এটি ৫৫০ থেকে ৬০০ এমবিপিএস বা তারও বেশি পৌঁছেছে।
তুলনামূলকভাবে ৪-জি নেটওয়ার্কে সাধারণত ১০ থেকে ৩০ এমবিপিএস গতি পাওয়া যায়।
আপলোড স্পিড
৫-জিতে তাত্ত্বিকভাবে ১০ জিবিপিএস পর্যন্ত আপলোড স্পিড পাওয়া সম্ভব। বড় ভিডিও, ক্লাউড ডেটা বা লাইভ সম্প্রচারের মতো কাজে এটি বড় সুবিধা দেবে।
লেটেন্সি
ইন্টারনেটে কোনো কমান্ড পাঠানোর পর সাড়া পেতে যে সময় লাগে তাকে লেটেন্সি বলা হয়।
৪-জিতে এই সময় তুলনামূলক বেশি হলেও ৫-জিতে তা ১ থেকে ১০ মিলিসেকেন্ডের মধ্যে নেমে আসতে পারে। ফলে অনলাইন গেমিং, ভিডিও কল বা রিমোট কন্ট্রোলড ডিভাইসে প্রায় তাৎক্ষণিক সাড়া পাওয়া যাবে।
সংযোগের সক্ষমতা
৫-জি প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১০ লাখ ডিভাইস সংযুক্ত রাখতে সক্ষম। ফলে ভবিষ্যতের স্মার্ট সিটি, স্মার্ট কারখানা ও আইওটি ডিভাইসভিত্তিক সেবাগুলো বাস্তবায়ন সহজ হবে।
অপারেটরদের বর্তমান অবস্থা
টেলিটক ও হুয়াওয়ের অংশীদারত্ব
সরকারি অপারেটর টেলিটকের পরীক্ষামূলক ৫-জি নেটওয়ার্ক স্থাপনে প্রযুক্তিগত সহযোগী হিসেবে কাজ করছে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে।
হুয়াওয়ে বাংলাদেশের প্রধান কারিগরি কর্মকর্তা (সিটিও) কেভিন স্যু জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটি ২০০৯ সাল থেকে ৫-জি গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগ করেছে এবং এ প্রযুক্তির প্রায় ৪০ শতাংশ পেটেন্ট তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ৫-জি সেবার জন্য যেখানে ১০০ মেগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সি আদর্শ, বাংলাদেশে আপাতত ৬০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম দিয়ে সেবা চালু হয়েছে। ভবিষ্যতে স্পেকট্রাম বাড়লে গতি ও সক্ষমতা আরও বাড়বে।
গ্রামীণফোন
গ্রামীণফোন দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে ৫-জি সেবা চালু করেছে। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে তারা ৫৫১ এমবিপিএস পর্যন্ত গতি পেয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
রবি
রবি ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ৫-জি সেবা চালু করেছে। তাদের নেটওয়ার্কে সর্বোচ্চ ৬২২ এমবিপিএস পর্যন্ত গতি রেকর্ড করা হয়েছে।
অপারেটরটি জানিয়েছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ২০০টির বেশি সাইটে এই সেবা সম্প্রসারণ করা হবে।
বাড়তি খরচ ছাড়াই ৫-জি
গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর হলো, ৫-জি ব্যবহারের জন্য আলাদা কোনো চার্জ দিতে হবে না। বিদ্যমান ৪-জি ইন্টারনেট প্যাকেজ দিয়েই এই সেবা ব্যবহার করা যাবে।
তবে দুটি শর্ত রয়েছে—
ব্যবহারকারীকে ৫-জি কভারেজ এলাকায় থাকতে হবে
ব্যবহৃত স্মার্টফোনটি অবশ্যই ৫-জি সমর্থিত হতে হবে
তবে ইন্টারনেটের গতি বেশি হওয়ায় ডেটা আগের তুলনায় দ্রুত শেষ হতে পারে বলে সতর্ক করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
কোন খাতে বদলে যাবে বাংলাদেশ?
স্মার্ট সিটি
ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা নজরদারি, স্মার্ট স্ট্রিটলাইট ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ৫-জি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শিল্প খাত
ইন্ডাস্ট্রি ৪.০ বাস্তবায়নে কলকারখানার মেশিনগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারবে। এতে উৎপাদন খরচ ও সময় কমবে।
স্বাস্থ্যসেবা
কম লেটেন্সির কারণে দূর থেকে অস্ত্রোপচার বা রিমোট সার্জারির মতো জটিল প্রযুক্তি বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
শিক্ষা
ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (VR) ও অগমেন্টেড রিয়েলিটি (AR) নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা আরও সহজলভ্য হবে।
পরিবহন
চালকবিহীন গাড়ি, স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম ও রিয়েল-টাইম নেভিগেশন প্রযুক্তির বিকাশে ৫-জি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সামনে যে চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫-জি প্রযুক্তির পূর্ণ সুবিধা পেতে হলে শুধু মোবাইল অপারেটর নয়, হ্যান্ডসেট নির্মাতা, নেটওয়ার্ক অবকাঠামো কোম্পানি এবং শিল্পখাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আরও বেশি বেস স্টেশন ও ফাইবার সংযোগ প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে সব বাধা কাটিয়ে ৫-জি প্রযুক্তি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।





















