আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত বিটিসিএলের ‘ফাইভজি রেডিনেস’ প্রকল্পের অর্থ ছাড় করাতে এবার দুর্নীতি দমন কমিশনকেই (দুদক) চিঠি দিয়ে ‘সহযোগিতা’ চেয়েছে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। দুদক যেখানে প্রকল্পে দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ পেয়ে অর্থছাড়কে অবৈধ বলছে, সেখানে মন্ত্রণালয়ের এই ‘তদবির’ বা সুপারিশ ঘিরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রায় ৩২৬ কোটি টাকার এই প্রকল্পের কার্যাদেশ চীনের টেলিযোগাযোগ সংস্থা হুয়াওয়েকে দেওয়ার প্রক্রিয়াটি শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। অভিযোগ রয়েছে, নজিরবিহীন দ্রুতগতিতে সরকারি ক্রয় নীতিমালা (সিপিটিইউ) লঙ্ঘন করে তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের একজন সচিব প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ পাইয়ে দেন।
এসব অনিয়ম খতিয়ে দেখতে গঠিত মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে একটি প্রতিবেদন জমা দেয়, যেখানে সাবেক ওই সচিবের বিরুদ্ধে সরাসরি গুরুতর ও নজিরবিহীন অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে সেই প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি।
এরই মধ্যে দুদকও প্রকল্পটির দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে এবং প্রাথমিক সত্যতা খুঁজে পায়। গত ১৮ জুন দুদক থেকে মন্ত্রণালয়কে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়, তদন্তাধীন একটি প্রকল্পে অর্থছাড় করা আইনসিদ্ধ হবে না।
কিন্তু দুদকের এই অবস্থানের মাত্র চারদিন পর, গত ২২ জুন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব দুদককে একটি ডিও লেটার (আধা-সরকারি পত্র) দেন। এতে তিনি প্রকল্পের অর্থছাড়ের বিষয়ে দুদকের ‘মনোযোগ ও সহায়তা’ কামনা করেন।
ডিও লেটারে তিনি যুক্তি দেখান, ‘দেশের বৃহত্তর স্বার্থে’, বিটিসিএলকে প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে পড়া থেকে রোধ করতে এবং এডিপি বাস্তবায়নের হার নিশ্চিত করতে প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান রাখা ‘একান্ত প্রয়োজন’। তিনি দাবি করেন, বিল দেওয়ার আগে বিশেষজ্ঞ কমিটি দিয়ে যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করা হবে।
যেভাবে হয়েছিল দুর্নীতি
পূর্বের সরকারের আমলে প্রকল্পটি নিয়ে তৎকালীন মন্ত্রী ও সচিবের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। মন্ত্রী টেন্ডার বাতিল করে নতুন করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দিলেও সচিব তা উপেক্ষা করেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি মাত্র একদিনের নোটিশে বিটিসিএলের বোর্ড সভা ডেকে একই দিনে আর্থিক মূল্যায়ন শেষ করে হুয়াওয়েকে কার্যাদেশ দেন। যে গতিতে এই কাজ সম্পন্ন হয়, তা সরকারি দপ্তরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ‘অবিশ্বাস্য’ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে দুদকের তদন্ত এবং মন্ত্রণালয়ের অর্থছাড়ের চেষ্টার এই দ্বিমুখী অবস্থানে প্রকল্পটি নিয়ে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
মাত্র দুই কর্মদিবসে, ছুটির দিনসহ ধরলে মোট চার দিনে বিটিসিএলের বোর্ড সব ধরনের যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণ শেষে ১২ নভেম্বর চূড়ান্ত নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেয়।
পিটিইউর সাবেক মহাপরিচালক একেএম ফজলুল করিম জানান, আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট সময় প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘মাত্র দুই কার্যদিবসের মধ্যে সব নথি মূল্যায়ন করা অসম্ভব। কারণ নথিগুলো অবশ্যই ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করতে হবে।’
পরদিন ১৩ নভেম্বর বিটিসিএলের ২১৬তম বোর্ড সভায় হুয়াওয়ের আর্থিক প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। এর পরের দিন হুয়াওয়েকে কাজের আদেশ পাওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে জানানো হয়।





















