‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন এবং ফোরজি নেটওয়ার্কের ব্যাপক প্রসারের প্রতিশ্রুতির পরেও দেশের মফস্বল বা গ্রামীণ এলাকার কোটি কোটি মানুষ ইন্টারনেট সেবা নিয়ে চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন। ধীরগতি, ঘন ঘন সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং উচ্চমূল্যের ইন্টারনেট প্যাকেজ—এই ত্রিমুখী সমস্যায় জর্জরিত গ্রামীণ জনজীবন। শহর ও গ্রামের মধ্যে তৈরি হওয়া এই ডিজিটাল বৈষম্য দেশের সামগ্রিক অগ্রযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজধানী বা বিভাগীয় শহরগুলোতে ইন্টারনেটের গতি ও সেবার মান কিছুটা সহনীয় হলেও, জেলা, উপজেলা এবং বিশেষ করে ইউনিয়ন পর্যায়ে গেলেই ইন্টারনেটের এক ভিন্ন চিত্র চোখে পড়ে। নামমাত্র ফোরজি নেটওয়ার্ক থাকলেও বাস্তবে গতি পাওয়া যায় থ্রিজি বা টুজির মতো। ফলে অনলাইন ক্লাস, ফ্রিল্যান্সিং, দাপ্তরিক কাজ কিংবা ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
মাঠপর্যায়ের চিত্র: ভোগান্তি যখন নিত্যসঙ্গী
এই ডিজিটাল ভোগান্তির অসংখ্য উদাহরণ ছড়িয়ে আছে সারা দেশে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে হতাশা আর পিছিয়ে পড়ার গল্প।
শিক্ষার্থীদের বঞ্চনা: গাইবান্ধার একটি গ্রামের কলেজছাত্রী মাইমুনা আক্তার বলেন, “অ্যাসাইনমেন্টের জন্য একটা পিডিএফ ফাইল ডাউনলোড করতে দিলে পুরো গ্রাম ঘুরতে হয় কোথায় নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। ক্লাসের সময় ভিডিও তো দূরের কথা, স্যারের কথাই ঠিকমতো শোনা যায় না। শহরের বন্ধুরা যেখানে অনলাইনে সব রিসোর্স পাচ্ছে, আমরা সেখানে একটা নোটিশ দেখতেও হিমশিম খাই।”
ফ্রিল্যান্সারদের সংগ্রাম: বরিশালের এক ছোট শহরে বসে ফ্রিল্যান্সিংয়ের চেষ্টা করছেন ইমরান হোসেন। তিনি তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, “সারারাত জেগে কাজ শেষ করে সকালে ফাইলটা আপলোড করতে গিয়ে দেখি ইন্টারনেট নেই। ক্লায়েন্টের কাছে ডেডলাইন পার হয়ে যায়, সুনাম নষ্ট হয়। এই ইন্টারনেটের কারণে বড় অংকের কাজ নিতে ভয় করে, যদি সময়মতো ডেলিভারি দিতে না পারি!”
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের লোকসান: নোয়াখালীর একটি বাজারের মুদি দোকানি আব্দুল জলিল বলেন, “এখন বেশিরভাগ কাস্টমার বিকাশে বা নগদে টাকা দিতে চায়। কিন্তু ইন্টারনেট স্লো বলে অ্যাপই ওপেন হয় না। ‘নেট নাই’ বলতে বলতে কাস্টমার বিরক্ত হয়ে অন্য দোকানে চলে যায়। দিনে কয়েকটা বিক্রি এভাবেই হাতছাড়া হয়। মহাজনের কাছে মালের অর্ডার পাঠাতেও সমস্যা হয়।”
কৃষিতে আধুনিকতার বাধা: রাজশাহীর এক তরুণ কৃষক জানান, “ইউটিউবে এখন কত নতুন চাষের পদ্ধতি, সার দেওয়া বা পোকা দমনের কৌশল দেখায়। আব্বাকে একটা ভিডিও দেখাবো বলে আধ ঘণ্টা চেষ্টা করেও পারিনি। আবহাওয়ার খবর বা ফসলের অনলাইন বাজার দর জানার জন্যও ইন্টারনেটের ওপর ভরসা করা যায় না। ডিজিটাল কৃষি আমাদের জন্য এখনো স্বপ্নই রয়ে গেছে।”
স্বাস্থ্যসেবায় সংকট: বান্দরবানের এক প্রত্যন্ত এলাকার বাসিন্দা তার মায়ের অসুস্থতার কথা বলতে গিয়ে বলেন, “আমার মায়ের ডায়াবেটিসের রিপোর্টটা ঢাকায় ডাক্তারকে দেখাবো বলে ছবি তুলে পাঠাতে পারছিলাম না। জরুরি প্রয়োজনে একজন ডাক্তারের সাথে ভিডিও কলে কথা বলা তো প্রায় অসম্ভব। এই ইন্টারনেট আমাদের জরুরি মুহূর্তে কোনো কাজেই আসে না।”
সমস্যার মূল কোথায়?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ভোগান্তির পেছনে একাধিক কারণ জড়িত। এর মধ্যে রয়েছে—মফস্বলে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অপারেটরদের বিনিয়োগে অনাগ্রহ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল তদারকি এবং ব্রডব্যান্ড সেবার সীমিত প্রসার।
‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ এর পথে বাধা
ডিজিটাল বৈষম্য দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভালো ইন্টারনেট না থাকায় গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা অনলাইন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তরুণরা ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো সম্ভাবনাময় খাতে যুক্ত হতে পারছে না এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ই-কমার্সের প্রসার ঘটছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ‘এক দেশ, এক রেট’ নীতি করলেই হবে না, সেবার মান নিশ্চিত করাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। মফস্বল এলাকায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অবকাঠামোগত বিনিয়োগ বাড়ানো এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিটিআরসিকে আরও কঠোর ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। অন্যথায়, শহর ও গ্রামের মধ্যে এই ডিজিটাল বিভাজন দেশের টেকসই উন্নয়নকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে।
জানতে চাইলে মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোশিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ‘ফোরজিতে গ্রাহক অনুপাতে সেবার মান আরও বাড়াতে হবে। বিভাগীয় বা জেলা শহরের সেবার তুলনায় মফস্বলের সেবা খুবই মানহীন। এখনো অনেক গ্রাম রয়েছে যেখানে ইন্টারনেট সেবা পেতে মানুষ প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এ জায়গা থেকে সরকার এবং অপারেটরগুলোকে বের হয়ে আসতে হবে।’






















