বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া হয়ে উঠেছে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে ইন্টারন্যাশনাল। রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের কাজ পেতে আমলাদের বিদেশ সফরের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা, রাজনৈতিক সংযোগ এবং প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।
গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ৯ মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটক থেকেই ১১৫ কোটি ২৫ লাখ টাকার ছয়টি পৃথক কার্যাদেশ পেয়েছে হুয়াওয়ে। শুধু দুটি প্রকল্প কার্যালয় থেকেই এই কাজগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়, যার তিনটি আবার দেওয়া হয় একদিনেই—গত ২৪ ডিসেম্বর।
আমলাদের সফর হুয়াওয়ের পৃষ্ঠপোষকতায়
টেলিকম বিভাগের সাবেক সচিব মুশফিকুর রহমানের একান্ত সচিব মোকলেছুর রহমানের স্পেন সফরের খরচ বহন করেছে হুয়াওয়ে। একইভাবে বিটিআরসির সাবেক এক মহাপরিচালকসহ কয়েকজন কর্মকর্তার চীন সফরেরও ব্যয়ভার ছিল হুয়াওয়ের ঘাড়ে।

দরপত্র প্রভাবিত করার অভিযোগ
বিটিসিএলের আলোচিত ‘৫জি রেডিনেস’ প্রকল্পের ১২৬ টেরাবাইট যন্ত্রপাতি কেনার দরপত্র ঘিরেও উঠে এসেছে হুয়াওয়ের নাম। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পটি পেতে হুয়াওয়েকে সহায়তা করেন তৎকালীন টেলিযোগাযোগ সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামান। তার একক আগ্রহেই প্রায় ৩১ কোটি টাকার কার্যাদেশ পায় হুয়াওয়ে। অথচ এ প্রকল্পের মূল্যায়ন সভায় একাধিকবার দরপত্র বাতিলের প্রস্তাব উঠেছিল।
সচিবের এই পক্ষপাতিত্বের কারণে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ান তিনি। এমনকি নতুন প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এলসি অনুমোদন পিছিয়ে দেন। কিন্তু পরবর্তীতে পলককে ‘ম্যানেজ’ করেই এলসি খোলার অনুমতি আদায় করে হুয়াওয়ে, এমন অভিযোগও উঠেছে।
এফপিএটি ছাড়াই আমদানির উদ্যোগ
চুক্তি অনুযায়ী যন্ত্রপাতি আমদানির আগে চীনে গিয়ে ‘ফ্যাক্টরি প্রিমিসেস অ্যাকসেপ্টেন্স টেস্ট’ (FPAT) সম্পন্ন করার কথা থাকলেও দুর্নীতির অভিযোগে চীন সফর নিষিদ্ধ থাকায় তা হয়নি। এরপরও ২০২৫ সালের ২৫ মে হুয়াওয়ের পক্ষে FPAT ছাড়াই আমদানির অনুমতি দিতে বিটিসিএলের এমডিকে চিঠি দেয় ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। চিঠিতে উল্লেখ ছিল, এটি প্রতিমন্ত্রীর ‘বিশেষ সহকারীর’ নির্দেশনায় দেওয়া হয়েছে।
ব্যবসায়ী সংগঠনের অর্থে চীন সফর
চীনা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত আদায়ের ক্ষেত্রে সম্প্রতি এক নজির গড়েছে চাইনিজ এন্টারপ্রাইজ অ্যাসোসিয়েশন মেম্বারস ইন বাংলাদেশ। সংগঠনটির সদস্য হুয়াওয়ের অর্থায়নে গত ৬ থেকে ১০ মে চীন সফর করেন প্রতিমন্ত্রী মর্যাদার ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। সফরের পরপরই হুয়াওয়ের অনুকূলে চিঠি দেওয়া হয় বিটিসিএলকে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবসায়ী সংগঠনের অর্থে বিদেশ সফর এবং পরে সেই সংগঠনের সদস্য প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সরকারি সিদ্ধান্ত দেওয়া একটি ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’-এর ক্লাসিক উদাহরণ।
বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ খাতের বড় অংশ এখন হুয়াওয়ের নিয়ন্ত্রণে। প্রশাসনিক প্রভাব, বিদেশ সফরের আর্থিক সহায়তা এবং রাজনৈতিক সংযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কার্যত ‘একচ্ছত্র আধিপত্য’ প্রতিষ্ঠায় মরিয়া। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় উদ্যোগ এবং প্রশ্ন উঠছে সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও।






















