বিশ্বজুড়ে মার্কেটিং ও সেলস খাত দ্রুততম সময়ে প্রযুক্তি-নির্ভর হয়ে উঠছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এখন আর ভবিষ্যতের কোনো কল্পকাহিনি নয়, বরং প্রতিদিনের কাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে বাস্তবতা হচ্ছে—এই প্রযুক্তি ব্যবহার যতটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, তার যথাযথ প্রশিক্ষণ ততটাই পিছিয়ে আছে। জেনারেল অ্যাসেম্বলির সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য: যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ৩০০-এর বেশি মার্কেটিং ও সেলস পেশাজীবীর মধ্যে ৬৮% নিয়মিতভাবে AI ব্যবহার করেন। কিন্তু মাত্র ১৭% পেয়েছেন কাজ-নির্দিষ্ট পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ।
এআই টুলের ব্যবহার: কন্টেন্ট থেকে কাস্টমার ম্যানেজমেন্ট
জরিপে অংশগ্রহণকারীরা জানিয়েছেন—
৫৭% কন্টেন্ট ক্রিয়েশন
৪৯% মার্কেট রিসার্চ ও অ্যানালিটিক্স
৪৭% সেলস অপারেশনস
৪২% কাস্টমার রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট (CRM)
৪১% বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপনা
অর্থাৎ, প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজের বড় অংশই এখন AI টুলের ওপর নির্ভরশীল। অনেকেই দিনে পাঁচবারের কম AI ব্যবহার করেন, আবার ২০% ব্যবহারকারী দিনে দশবারেরও বেশি এর সহায়তা নেন।
প্রশিক্ষণের অভাব: শাসন ও ব্র্যান্ড সুরক্ষায় হুমকি
তবে আশঙ্কার জায়গা হচ্ছে প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা। গবেষণা অনুযায়ী—
৩২% পেশাজীবী কোনো আনুষ্ঠানিক AI প্রশিক্ষণ পাননি।
২০% মনে করেন তাদের প্রশিক্ষণ ছিল অত্যন্ত সাধারণ।
১৫% বলেন এতে কেবল ধারণা দেওয়া হয়েছে, বাস্তব প্রয়োগ শেখানো হয়নি।
১৬% নিজেরাই স্বতন্ত্রভাবে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
এই ঘাটতিই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। কারণ, যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া এআই টুলের ভুল ব্যবহার শুধু কার্যকারিতাই কমিয়ে দেবে না, বরং ব্র্যান্ড সুরক্ষা, ডেটা নিরাপত্তা ও গ্রাহক আস্থার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
জেনারেল অ্যাসেম্বলির চিফ বিজনেস অফিসার জর্ডান হ্যাথাওয়ে বলেন, “তিন বছর আগে সাধারণ AI প্রশিক্ষণই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু এখন প্রতিটি বিভাগকে আলাদাভাবে কাজ-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ নিতে হবে। না হলে ঝুঁকি এড়ানো যাবে না।”
তার মতে, মার্কেটিং ও সেলস দল যত দ্রুত AI গ্রহণ করছে, তাদের দক্ষতার ঘাটতি ঠিক তত দ্রুত সমস্যা তৈরি করছে।
ইতিবাচক দিক: সময় বাঁচাচ্ছে এআই
তবুও আশাব্যঞ্জক কিছু দিকও আছে।
৬৭% পেশাজীবী বলেছেন AI তাদের কৌশলগত কাজে সময় দিয়েছে।
৫৬% দাবি করেছেন দলীয় কার্যকারিতা বেড়েছে।
অর্থাৎ, সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে এআই মানবসম্পদের উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ বাড়াতে সক্ষম।
বিতর্ক: গ্রাহক আস্থা ও ROI নিয়ে দ্বন্দ্ব
তবে বিতর্ক এখানেই।
৬০% এখনো নিশ্চিত নন AI রাজস্ব বাড়াচ্ছে কিনা।
৪৬% সন্দেহ করেন AI গ্রাহক অভিজ্ঞতায় সত্যিই ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে কিনা।
২২% মনে করেন উৎপাদনশীলতায় কোনো উন্নতি হয়নি।
১৮% অভিযোগ করেছেন AI আসলে তাদের কাজের চাপ বাড়াচ্ছে।
এ থেকে বোঝা যায়, AI এখনো সব প্রতিষ্ঠানের জন্য “গেম চেঞ্জার” হয়ে ওঠেনি। বরং প্রশিক্ষণ ও সঠিক কৌশল ছাড়া এটি দ্বি-ধারী তলোয়ারের মতো কাজ করছে।
গবেষকরা বলছেন, AI এখন আর বিলাসিতা নয়—এটি ব্যবসার আবশ্যকীয় টুল। তাই প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবিলম্বে বিভাগ-নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ ও নীতি প্রণয়ন করতে হবে। অন্যথায় এই প্রযুক্তি যেমন সাফল্যের দুয়ার খুলতে পারে, তেমনি বিশাল ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
হ্যাথাওয়ের মতে, “AI এজেন্টরা যখন জটিল দায়িত্ব নিচ্ছে, তখন সেলস ও মার্কেটিং দলগুলোর পক্ষে দক্ষতার সঙ্গে এগুলো ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য।”
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশের মার্কেটিং ও সেলস দল কতটা প্রস্তুত? এখনই যদি কাজ-ভিত্তিক প্রশিক্ষণের ওপর জোর না দেওয়া হয়, তবে AI আমাদের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং নতুন সংকটের কারণ হয়ে উঠতে পারে।






















