দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে বড় ধরনের সংস্কার আনতে যাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘টেলিকমিউনিকেশনস নেটওয়ার্ক অ্যান্ড লাইসেন্সিং পলিসি ২০২৫’ শীর্ষক একটি নতুন নীতিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই নীতিমালার অধীনে বর্তমানের বহুস্তরবিশিষ্ট এবং জটিল লাইসেন্সিং ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে একটি সহজ ও আধুনিক কাঠামো তৈরি করা হবে। এর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে উঠে যাচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে (আইজিডব্লিউ), ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) এবং ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জের (আইসিএক্স) মতো লাইসেন্সগুলো।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের পক্ষ থেকে গত জুলাই মাসে প্রকাশিত এই নীতিমালা টেলিযোগাযোগ খাতে এক দশকেরও বেশি সময় পর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কেন এই পরিবর্তন?
নীতিমালায় বলা হয়েছে, ২০১০ সালের ইন্টারন্যাশনাল লং-ডিসটেন্স টেলিকমিউনিকেশনস সার্ভিসেস (আইএলডিটিএস) নীতি এবং এর অধীনে তৈরি হওয়া লাইসেন্সিং কাঠামো বর্তমান প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও বাজারের চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। একাধিক স্তরের লাইসেন্সিং ব্যবস্থা এই খাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজের চাপ বাড়িয়েছে, পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি করেছে এবং অসুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করেছে। এর ফলে নতুন বিনিয়োগ ও উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল।
নতুন ৪ শ্রেণীর লাইসেন্স
নতুন নীতিমালায় পুরো টেলিযোগাযোগ খাতকে মূলত চারটি প্রধান লাইসেন্স ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে:
- অ্যাক্সেস নেটওয়ার্ক সার্ভিস প্রোভাইডার (ANSP): এই লাইসেন্সের অধীনে সেলুলার মোবাইল এবং ফিক্সড টেলিযোগাযোগ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি গ্রাহকদের সেবা দেবে।
- ন্যাশনাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড কানেক্টিভিটি সার্ভিস প্রোভাইডার (NICSP): জাতীয় পর্যায়ে টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো, যেমন—ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক এবং টাওয়ার সুবিধা প্রদান করবে।
- ইন্টারন্যাশনাল কানেক্টিভিটি সার্ভিস প্রোভাইডার (ICSP): এই প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক ভয়েস কল, ইন্টারনেট এবং ডেটা সংযোগের দায়িত্বে থাকবে।
- নন-টেরিস্ট্রিয়াল নেটওয়ার্কস অ্যান্ড সার্ভিস প্রোভাইডার (NTNSP): স্যাটেলাইট এবং অন্যান্য নন-টেরিস্ট্রিয়াল (ভূমিহীন) নেটওয়ার্ক-ভিত্তিক সেবা প্রদান করবে।
এছাড়াও, টেলিকম-ভিত্তিক সেবা, যেমন—এসএমএস অ্যাগ্রিগেটরদের জন্য ‘টেলিকম এনাবলড সার্ভিস প্রোভাইডার (TESP)’ নামে একটি তালিকাভুক্তি বা এনলিস্টমেন্ট ক্যাটাগরি থাকবে।
যেসব লাইসেন্স বিলুপ্ত ও নিয়ন্ত্রণমুক্ত হচ্ছে
নতুন এই কাঠামোর আওতায় বেশ কিছু লাইসেন্স মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিলুপ্ত করা হবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে (IGW)
- ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (IIG)
- ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ (ICX)
- মোবাইল নম্বর পোর্টেবিলিটি (MNP)
এছাড়া, ন্যাশনাল ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ (NIX), কল সেন্টার, টেলিকম ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস (TVAS) এবং ভেহিকল ট্র্যাকিং সার্ভিস (VTS) লাইসেন্সগুলোকে নিয়ন্ত্রণমুক্ত বা ডি-রেগুলেট করা হবে।
বাস্তবায়ন ও লক্ষ্য
নীতিমালা অনুযায়ী, বিদ্যমান লাইসেন্সধারীদের নতুন ব্যবস্থায় স্থানান্তরের জন্য একটি তিন ধাপের রূপান্তর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি ২০২৭ সালের ৩০শে জুনের মধ্যে চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন করার একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই সংস্কারের মূল লক্ষ্য হলো টেলিযোগাযোগ খাতে একটি বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ তৈরি করা, উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা, সেবার মান উন্নত করা এবং গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে উন্নত সেবা নিশ্চিত করা।






















