রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত—সর্বত্রই মোবাইল নেটওয়ার্কের দুর্বল মান নিয়ে গ্রাহকদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। কথা বলতে গিয়ে কল ড্রপ, ইন্টারনেটে ধীরগতি এবং নেটওয়ার্কের অনুপস্থিতি এখন দৈনন্দিন সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে, দেশে ফাইভ-জি (5G) প্রযুক্তির আগমনকে সাধারণ গ্রাহকরা ‘বিলাসিতা’ হিসেবেই দেখছেন। তাদের মতে, যেখানে মৌলিক সেবাই নিশ্চিত নয়, সেখানে পঞ্চম প্রজন্মের এই প্রযুক্তি কার স্বার্থে?
বিভিন্ন অপারেটরের গ্রাহকরা তাদের দৈনন্দিন ভোগান্তির কথা টেকজুম ডটটিভিকে জানিয়েছেন।
ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশে পড়াশোনা করেন তানজিম হোসেন অন্তর ব্যবহার করেন গ্রামীণফোনের সিম দেশের ৫জি চালুর হওয়াতে তিনি বলেন, দুর্বল নেটওয়ার্কের কারণে কথা বলতে সমস্যা হয়নি এমন একটি দিনের কথাও মনে করতে পারেন না তিনি। রুমের ভেতর কাজ করলেও নেটওয়ার্ক পেতে মোবাইল ধরে রাখতে হয় জানালার বাইরে। গ্রামীণফোনে উচিত আগে দুর্বল নেটওয়ার্ক ঠিক করা তারপরে ৫জি নিয়ে ভাবা ।
গ্রামীণফোনের একজন গ্রাহক, আজমল হোসেন (ধানমন্ডি, ঢাকা): “আমি দেশের সবচেয়ে বড় অপারেটরের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করি, অথচ নিজের বাসার ভেতরেই ঠিকমতো কথা বলতে পারি না। বারান্দায় গিয়ে কথা বলতে হয়। প্রায়ই কল কেটে যায়। ইন্টারনেটের প্যাকেজ কিনি 4G, কিন্তু স্পিড পাই 2G-এর মতো। অথচ টাকা ঠিকই কেটে নেই। এখন শুনছি তারা 5G আনবে। এটা একটা তামাশা ছাড়া আর কিছুই না।”
রবির একজন গ্রাহক, সুমাইয়া আক্তার (চট্টগ্রাম শহর): “রবির ‘সেরা কভারেজ’ এর বিজ্ঞাপন দেখে সিম কিনেছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি, ঘরের ভেতরে নেটওয়ার্কের বার ওঠানামা করে। মাঝে মাঝে ফোনে পুরো দাগ দেখায়, কিন্তু কল করলে বলে ‘নেটওয়ার্কে সংযোগ করা যাচ্ছে না’। ডেটা অন করলে ওয়েবসাইট লোড হতে মিনিটখানেক লেগে যায়। কল সেন্টারে অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি।”
বাংলালিংকের একজন গ্রাহক, রফিকুল ইসলাম (বগুড়া সদর): “গ্রামে তো নেটওয়ার্ক পাওয়াই যায় না, এখন জেলা শহরেও একই অবস্থা। দিনের বেলা কোনোমতে ইন্টারনেট চললেও, সন্ধ্যার পর গতি একেবারেই কমে যায়। ইউটিউবে ভিডিও দেখা তো দূরের কথা, ফেসবুকের ছবি লোড হতেই অনেক সময় লাগে। আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলি, কিন্তু বাস্তবতা হলো আমরা এখনও নিরবচ্ছিন্নভাবে কথা বলার নেটওয়ার্কই পাইনি। 5G আমাদের জন্য বিলাসিতা।”
ফেসবুকে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “৩-জি-ই ঠিকমতো চলে না, তার ওপর আবার ৫-জি চালু হলো! এটা কি আমাদের সঙ্গে রসিকতা?”
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে মোট টাওয়ারের সংখ্যা ৪৫ হাজার ৫৭৪টি, যা চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ। আর তাই মোবাইল টাওয়ার–স্বল্পতা নিরসনে টাওয়ার সেবা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আন্তশেয়ারিং, টাওয়ার পরিচালনায় সোলার প্যানেল স্থাপনসহ বিটিআরসির কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
রাজধানী থেকে গ্রাম, সর্বত্রই ভোগান্তি
ঢাকার অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক কেন্দ্র, এমনকি সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও মোবাইল ফোনে ঠিকমতো কথা বলা কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি কলের জন্য গ্রাহকদের একাধিকবার চেষ্টা করতে হয়। ঢাকার বাইরের অবস্থা আরও করুণ। মহাসড়ক, গ্রামীথঞ্চল, এমনকি অনেক জেলা শহরেও নেটওয়ার্কের মান অত্যন্ত দুর্বল। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সর্বশেষ জরিপেও এর প্রমাণ মিলেছে।
সরকার এবং অপারেটররা ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের অংশ হিসেবে দেশে ৫জি প্রযুক্তি নিয়ে এসেছে। তবে সাধারণ গ্রাহকদের কাছে এই উদ্যোগ প্রহসনের মতো মনে হচ্ছে। তাদের সম্মিলিত বক্তব্য হলো, “আগে আমাদের ঠিকমতো কথা বলার এবং নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ করে দিন, তারপর না হয় ৫জির স্বপ্ন দেখব।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের ৯০ শতাংশের বেশি গ্রাহক এখনও দুর্বল নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। তাদের জন্য মানসম্মত সেবা নিশ্চিত না করে সরকার এবং অপারেটররা কাদের জন্য ৫জি চালু করছে বুঝে আসেনা। বর্তমানে গ্রাহকদের চাহিদা যেভাবে বাড়ছে সে অনুযায়ী ইন্টারনেটের গতি বাড়েনি। ফলে গ্রাহক অসন্তোষ এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইন্টারনেটের ডাটা থাকলেও ইন্টারনেটের গতি না থাকায় অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে ইন্টারনেটের ডাটা। মোবাইল ইন্টারনেট সেবা খাতে অনেক বৈষম্য ও সংকট যেমন চলমান আছে ঠিক একইভাবে সঠিক নজরদারিতে কমিশনের আন্তরিকতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি অপারেটরদের মনোপলি বা তাদের ব্যবসার দিকে কেবল নজর থাকার কারণে সেবার মান বাড়ছে না। কারণ, বর্তমানে ইন্টারনেটে উচ্চগতি থাকা কেবল দেশের গ্রাহকদের জন্য নয় বরং শিল্প উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ টেকজুম ডটটিভিকে বলেন, ফাইভ জির প্রয়োজনীয়তা আসলে সাধারণ গ্রাহকদের চাইতে ফ্রিল্যান্সার, ব্যাংক বীমা প্রতিষ্ঠান, উৎপাদন ও কৃষি কাজে বেশি প্রয়োজন। আইওটি বিকাশে ৫জির প্রয়োজনীয়তা সর্বাধিক। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ফাইভ-জি ব্যবহারের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়নি। হয়নি সড়ক নির্মাণ, বলা হচ্ছে গ্রাহকদের সুবিধার্থে ফাইভ-জি চালু করা হয়েছে, বাস্তবতা হলো দেশের নব্বই শতাংশ জনগোষ্ঠী এখনো দুর্বল নেটওয়ার্কের ভোগান্তিতে আছে। ৬৫ শতাংশ ওভারহেড ফাইবার নেটওয়ার্ক। নেই ডিভাইস, ফাইভ-জি জন্য নেই পর্যাপ্ত তরঙ্গ বরাদ্দ। এটা আমার কাছে মনে হচ্ছে জনগণের কাছে একটি বাহবা নেয়ার জন্য বর্তমান সরকারের একটি কৌশল হতে পারে।






















