রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) অনুমোদিত জনবলকাঠামোর (অর্গানোগ্রাম) তোয়াক্কা না করে অতিরিক্ত লোকবল নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। ‘সহকারী ব্যবস্থাপক (কারিগরি)’ পদে ৬৭টি পদ খালি থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি ৯২ জন নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে, যা অনুমোদিত পদের চেয়ে ২৫ জন বেশি।
এই ‘অগ্রিম’ নিয়োগকে ঘিরে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে-বাইরে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বিদ্যমান কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে বিশেষ সুবিধায় পদোন্নতি দেওয়ার ছক কষেই পদ খালি হওয়ার আগেই এই অতিরিক্ত নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা এমন অগ্রিম নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সরাসরি ‘বেআইনি’ এবং ‘সংবিধান পরিপন্থি’ বলে অভিহিত করেছেন।
পদোন্নতির ‘আশায়’ অগ্রিম নিয়োগ
গত ৮ সেপ্টেম্বর বিটিসিএল এই বিতর্কিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। ৬৭টি শূন্য পদের বিপরীতে ৯২ জনকে নিয়োগের এই উদ্যোগের বিষয়ে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ (পিটিডি) অদ্ভুত এক ব্যাখ্যা দিয়েছে।
পিটিডি-এর দাবি, আগামী ডিসেম্বরের শেষে ‘সহকারী ব্যবস্থাপক’ থেকে ‘ব্যবস্থাপক’ পদে ২৫ জনের পদোন্নতি হতে পারে। সেই পদোন্নতির ফলে যে ২৫টি পদ শূন্য হবে, তা পূরণের জন্যই “অগ্রিম” এই নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কারণ নিয়োগ প্রক্রিয়া দীর্ঘ।
তবে এই ব্যাখ্যার পরপরই নতুন বিতর্কের জন্ম হয়েছে। খোদ বিটিসিএলের কর্মকর্তারাই প্রশ্ন তুলেছেন, যেখানে পদোন্নতি পরীক্ষার ফলাফলই হয়নি, সেখানে ২৫ জন যে পদোন্নতি পাবেনই—এমন নিশ্চয়তা কর্তৃপক্ষ কীভাবে পেল?
পদোন্নতি পরীক্ষার ‘লোকদেখানো’ ইতিহাস
বিটিসিএলের অতীতের রেকর্ড এই ‘অগ্রিম’ নিয়োগের justificaton-কে আরও দুর্বল করে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, এর আগে ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতির জন্য দুবার পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও প্রতিবারই প্রায় অর্ধেক কর্মকর্তা অকৃতকার্য হয়েছেন।
- ২০১৬ সালের ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে পদোন্নতি পরীক্ষায় মাত্র ১৭ জন কৃতকার্য হন, অকৃতকার্য হন দ্বিগুণ (৩৪ জন)।
- ২০১৮ ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে ২৭ জন কৃতকার্য হলেও ৫ জন অকৃতকার্য হন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আসন্ন পদোন্নতি পরীক্ষায়ও যদি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মকর্তা কৃতকার্য না হন এবং অতিরিক্ত ৯২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়, তবে নতুনদের পদায়ন নিয়ে চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হবে।
অনেক কর্মকর্তা এই আসন্ন পদোন্নতি পরীক্ষাকে ‘লোকদেখানো’ এবং ‘নতুন যোগসাজশ’ হিসেবে উল্লেখ করছেন। তাদের আশঙ্কা, “নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের পাস করিয়ে দেওয়ার জন্যই আগে থেকে পদের সংখ্যা গণনা করে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।”
তদন্তের মধ্যেই নতুন অনিয়মের শঙ্কা
বিটিসিএলে পদোন্নতি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। ডিপ্লোমা পাস টেকনিশিয়ানদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে ঘুষের বিনিময়ে সহজ প্রশ্নপত্র প্রণয়ন এবং অর্থের বিনিময়ে পদোন্নতির একটি গুরুতর অভিযোগ নিয়ে ইতোমধ্যে তদন্ত চলছে। গত ৩ আগস্ট এই অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের কমিটিও গঠন করা হয়।
কর্মকর্তারা বলছেন, যেখানে একটি দুর্নীতি তদন্তাধীন, ঠিক সেই সময়ে এ ধরনের একটি অস্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনার ওপর থেকে আস্থা নষ্ট করে দিচ্ছে।
‘অগ্রিম নিয়োগ সংবিধান পরিপন্থি’
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা এই প্রক্রিয়াকে সরাসরি বেআইনি বলছেন। সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, “ভবিষ্যতে পদ শূন্য হবে—এই আশায় এখনই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা নিয়োগ দেওয়া বেআইনি এবং সংবিধান পরিপন্থি।”
তিনি এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, “সংবিধানে প্রত্যেক নাগরিকের সমান সুযোগ লাভের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। আজ যখন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হচ্ছে, তখন হয়তো একজনের আবেদনের যোগ্যতা নেই। কিন্তু ভবিষ্যতে যখন সত্যিই পদ শূন্য হবে, তখন বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলে হয়তো তার আবেদনের যোগ্যতা থাকত। অর্থাৎ, আজকের এই বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ওই ব্যক্তিকে তার সাংবিধানিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হবে।” তিনি আরও জানান, প্রতিবেশী দেশ ভারতেও উচ্চ আদালতের রায়ে এমন অগ্রিম নিয়োগ প্রক্রিয়াকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের নীরবতা
এই বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুনুর রশীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি “এ বিষয়ে জেনে পরবর্তীতে জানাবেন” বলে জানান এবং জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক রওনক তাহমিনার সঙ্গে যোগাযোগ করে লিখিত প্রশ্ন পাঠালেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।






















