দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে এক যুগান্তকারী সংস্কার আসছে। সরকার ‘টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং লাইসেন্সিং নীতিমালা, ২০২৫’ অনুমোদন করেছে, যা গতানুগতিক ও জটিল ব্যবস্থা ভেঙে একটি আধুনিক, গ্রাহকবান্ধব ও উদ্ভাবন-সহায়ক পরিবেশ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই নীতিমালার মাধ্যমে ২০১০ সালের পুরনো ও অকার্যকর ‘ইন্টারন্যাশনাল লং ডিসটেন্স টেলিকমিউনিকেশন সার্ভিস (আইএলডিটিএস)’ নীতি বাতিল করা হলো ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই নতুন নীতি দেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্বকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি টেলিযোগাযোগ খাতে নতুন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে এবং গ্রাহকসেবার মান বাড়াতে বাধ্য করবে।
ভেঙে ফেলা হচ্ছে পুরনো ও জটিল কাঠামো সরকারের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০১০ সালের পুরনো নীতিটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে “ক্রমবর্ধমানভাবে পুরানো এবং খণ্ডিত” হয়ে পড়েছিল । এটি বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিল না এবং বাজারের পরিবর্তন বা গ্রাহকের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছিল । এর ফলে পুরো খাতটি “জটিল এবং পদ্ধতিগত চ্যালেঞ্জের” সম্মুখীন হয়েছিল ।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে লাইসেন্সিং কাঠামোতে। পূর্বের বহু-স্তরবিশিষ্ট লাইসেন্সিং ব্যবস্থার (যেমন: আইজিডব্লিউ, আইআইজি, আইসিএক্স) কারণে প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল । নতুন নীতিমালায় এই অপ্রয়োজনীয় স্তরগুলো (আইজিডব্লিউ, আইআইজি, আইসিএক্স) বাতিল করে লাইসেন্সিং ব্যবস্থাকে সহজ করা হয়েছে ।
লক্ষ্য সেবার মান বৃদ্ধি ও খরচ কমানো এই সংস্কারের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য গ্রাহকদের জন্য “উচ্চ-মানের, নির্ভরযোগ্য এবং সাশ্রয়ী” ভয়েস ও ডেটা সেবা নিশ্চিত করা । নীতিমালায় একটি “সরলীকৃত নেটওয়ার্ক টপোলজি” বা সহজ কাঠামো প্রতিষ্ঠা করার কথা বলা হয়েছে । অপ্রয়োজনীয় নেটওয়ার্ক স্তরগুলো বাদ দেওয়ায় টেলিকম কোম্পানিগুলোর অপারেশনাল খরচ কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে, যার সুফল গ্রাহকরা পাবেন।
গ্রাহকসেবার মান নিশ্চিত করতে সকল লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানকে বিটিআরসি কর্তৃক নির্ধারিত ‘কোয়ালিটি অফ সার্ভিস (QoS)’ মানদণ্ড কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে । সেবার মানে স্বচ্ছতা আনতে বিটিআরসি একটি “ন্যাশনাল QoS অ্যান্ড পারফরম্যান্স ড্যাশবোর্ড” প্রতিষ্ঠা করবে, যেখানে নেটওয়ার্কের কর্মক্ষমতা সম্পর্কিত রিয়েল-টাইম তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে ।
শক্তিশালী হচ্ছে ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব ও ডেটা সুরক্ষা পূর্বের নীতির দুর্বলতার কারণে দেশে “অপর্যাপ্ত ডেটা সেন্টার অবকাঠামো”, “জাতীয় ফাইবার নেটওয়ার্কের স্বল্প ব্যবহার”, এবং “সাবমেরিন কেবলের অলস সক্ষমতা” বিদ্যমান ছিল । এর ফলে দেশের ইন্টারনেট ট্র্যাফিক প্রায়ই বিদেশি রুটে চলে যাচ্ছিল, যা “জাতীয় ডিজিটাল সার্বভৌমত্বকে দুর্বল” করে দিচ্ছিল ।
নতুন নীতিমালায় এই সংকট সমাধানে জোর দেওয়া হয়েছে। “হাইপারস্কেলার” (যেমন গুগল, আমাজন, মাইক্রোসফটের মতো বড় ক্লাউড সেবাদানকারী) প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে ডেটা সেন্টার স্থাপনে উৎসাহিত করা হবে । এর ফলে দেশের ডেটা দেশেই থাকবে, ইন্টারনেট সেবা দ্রুততর হবে এবং জাতীয় তথ্যের সুরক্ষা বাড়বে। এছাড়া, সকল ইন্টারনেট সেবাদানকারীকে (আইসিএসপি) বাধ্যতামূলকভাবে নিজেদের মধ্যে “ডোমেস্টিক পিয়ারিং” (অভ্যন্তরীণ ট্র্যাফিক বিনিময়) চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । এর ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেট ট্র্যাফিক অপ্রয়োজনে আন্তর্জাতিক রুট ঘুরে আসবে না, যা খরচ কমাবে এবং ইন্টারনেটের গতি বাড়াবে।
বিনিয়োগ আকর্ষণ ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা পুরনো জটিল ব্যবস্থার কারণে বাজারে নতুনদের প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল এবং উদ্ভাবন ও বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছিল । নতুন নীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো একটি “ব্যবসা-বান্ধব এবং উদ্ভাবন-চালিত লাইসেন্সিং কাঠামো” তৈরি করা । এটি টেলিযোগাযোগ খাতে টেকসই দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সহায়তা করবে । পাশাপাশি, নিয়ন্ত্রক জটিলতা কমিয়ে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্যও সমান সুযোগের ক্ষেত্র তৈরি করার কথা বলা হয়েছে ।
বৈষম্য কমানো, জননিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষা নীতিমালায় প্রথমবারের মতো শহর ও গ্রামের ডিজিটাল বৈষম্য কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এটি “শহর-গ্রামের বৈষম্য” এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম, উপকূলীয় ও অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের মতো “ভৌগোলিক বৈষম্য” কমাতে কাজ করবে । সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী, যেমন “প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং প্রবীণদের” জন্য ডিজিটাল সেবা সহজলভ্য করাকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে ।
জননিরাপত্তার স্বার্থে, সকল লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানকে “জাতীয় জরুরি সতর্কতা সিস্টেমের” সাথে একীভূত হতে হবে । এর ফলে দুর্যোগ বা জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে জনগণকে দ্রুত সতর্কবার্তা পাঠানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি, টেলিকম নেটওয়ার্ককে “গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো (সিআইআই)” হিসেবে গণ্য করে তা সুরক্ষায় সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ মেনে চলা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ।
এই নীতিমালায় প্রথমবারের মতো পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে। লাইসেন্সপ্রাপ্তদের “পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি” গ্রহণ, “নবায়নযোগ্য শক্তি” (যেমন সোলার) ব্যবহার এবং বাধ্যতামূলকভাবে “ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা” (E-Waste Management) সংক্রান্ত জাতীয় প্রবিধান মেনে চলতে হবে ।






















