গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোতে চীনা প্রযুক্তি ব্যবহার বন্ধ করতে এক যুগান্তকারী ও কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে জার্মানি। সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি এড়াতে দেশটির ফেডারেল পার্লামেন্ট সম্প্রতি একটি নতুন আইন পাস করেছে, যেখানে হুয়াওয়ে ও জেডটিই-এর মতো চীনা কোম্পানির সরঞ্জাম ব্যবহারে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
গত ১৩ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখে পাস হওয়া এই আইন কার্যকরের লক্ষ্যে, ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যেই ৫জি কোর নেটওয়ার্ক থেকে সমস্ত চীনা সরঞ্জাম সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জার্মানি অবশেষে সেই সিদ্ধান্ত নিল, যেটি নিয়ে ইউরোপ বহু বছর ধরে দ্বিধায় ছিল। এই আইনের মাধ্যমে বার্লিন স্পষ্ট করে দিল যে, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ঝুঁকি নেওয়া হবে না এবং ভবিষ্যতের ৬জি নেটওয়ার্ককে চীনা প্রযুক্তি থেকে পুরোপুরি মুক্ত রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য।
‘৬জি নেটওয়ার্কে চীন থাকবে না’ বার্লিনে এক অনুষ্ঠানে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ (Friedrich Merz) এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, “আইন অনুযায়ী, ৫জি কোর নেটওয়ার্কে থাকা সব চীনা সরঞ্জাম ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সরিয়ে ফেলতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন হলে সরকার টেলিকম অপারেটরদের আর্থিক সহায়তাও দিতে পারে।”
ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি নিয়ে তিনি আরও কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন, “৬জি নেটওয়ার্কে চীনের কোনো অংশ আমরা ব্যবহার করবো না।”
নতুন এই আইনে জার্মানির ইন্টেরিয়র মন্ত্রণালয়কে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় যদি কোনো কোম্পানিকে ‘নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ’ মনে করে, তাহলে সেই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে নিষিদ্ধ করতে পারবে। শুধু তাই নয়, চলমান নেটওয়ার্ক থেকেও দ্রুত সরঞ্জাম অপসারণের নির্দেশ দিতে পারবে। এই আইন শুধু টেলিকম নয়, বরং বিদ্যুৎ, পরিবহণ, স্বাস্থ্য, ও ডিজিটাল অবকাঠামোসহ সব গুরুত্বপূর্ণ খাতের জন্যই প্রযোজ্য হবে।
বাণিজ্য ও নিরাপত্তার ভারসাম্য তবে চীনের সঙ্গে জার্মানির দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে এবং চীন দেশটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাণিজ্য অংশীদার। এই বাস্তবতায় চ্যান্সেলর মার্জ বলেন, “চীনের সঙ্গে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়া (Decoupling) সম্ভব নয়। কিন্তু ঝুঁকি আমরা উপেক্ষা করতে পারি না।”
এদিকে জার্মানির প্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, হঠাৎ করে সরবরাহকারী পরিবর্তন করলে নেটওয়ার্ক আপগ্রেডেশনের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
ইউরোপে ‘ডমিনো এফেক্ট’ জার্মানির এই পদক্ষেপের পর ইউরোপের অন্যান্য দেশও এখন চীনা প্রযুক্তির নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জার্মানির এই সিদ্ধান্ত পুরো ইউরোপে একটি ‘ডমিনো এফেক্ট’ তৈরি করবে।
ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) একটি ‘আইসিটি সাপ্লাই চেইন টুলবক্স’ তৈরি করছে, যার লক্ষ্য পুরো ইউরোপজুড়ে চীনা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমানো। ইইউ এমন নতুন নীতিমালা তৈরি করছে, যেখানে টেলিকম ছাড়াও সৌরশক্তি, ইলেকট্রিক গাড়ি ও স্মার্ট ডিভাইসের ক্ষেত্রেও সরবরাহকারীর নিরাপত্তা যাচাই বাধ্যতামূলক করা হবে।





















