চোরের স্বভাব চুরি করা—এই প্রবাদটিই যেন বর্তমানে দেশের মোবাইল অপারেটরগুলোর ক্ষেত্রে ধ্রুব সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, সেবার নামে অপারেটররা প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে, আর এই চুরি রোধে যার অভিভাবক হওয়ার কথা, সেই নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি (BTRC) পালন করছে নীরব দর্শকের ভূমিকা।
গত ২৫ নভেম্বর দেশীয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘কনভে’-তে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক গণশুনানিতে গ্রাহকদের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। সেখানে জমা পড়া প্রায় দেড় হাজার অভিযোগের চিত্র বলে দেয়, দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে গ্রাহকরা কতটা অসহায়।
গণশুনানিতে উঠে আসা ভয়াবহ চিত্র বিটিআরসির এই শুনানিতে গ্রাহকরা মোবাইল কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে যেসব গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো:
১. ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস (VAS) সন্ত্রাস: গ্রাহকের অজান্তেই বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় সার্ভিস চালু করে ব্যালেন্স থেকে টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে।
২. নেটওয়ার্ক ও কল ড্রপ: ফোর-জি বা ফাইভি-জি’র কথা বলা হলেও বাস্তবে নেটওয়ার্ক অত্যন্ত দুর্বল। কল ড্রপ এবং ধীরগতির ইন্টারনেটের কারণে গ্রাহকরা টাকা দিয়েও সেবা পাচ্ছেন না।
৩. প্যাকেজের গোলকধাঁধা: হাজার রকমের অফার ও প্যাকেজের নামে গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। মেয়াদ শেষ হলেই অব্যবহৃত ডেটা বা মিনিট কেটে নেওয়া হচ্ছে।
৪. সিম রিপ্লেসমেন্ট ও মালিকানা জটিলতা: সিম রিপ্লেস করতে গেলে বাড়তি টাকা আদায় এবং ৪৫০ দিন সিম বন্ধ থাকলে মালিকানা চলে যাওয়ার মতো বিতর্কিত নিয়ম নিয়ে ভোগান্তির শেষ নেই।
৫. বিরক্তিকর প্রমোশনাল কল: সময়-অসময়ে অপ্রয়োজনীয় বিজ্ঞাপনী ফোনকলে অতিষ্ঠ জনজীবন।
বিটিআরসি: নিয়ন্ত্রক নাকি দর্শক? গ্রাহকদের অভিযোগ, মোবাইল কোম্পানিগুলোর এই অনিয়ম নতুন কিছু নয়। প্রতিবছরই এমন হাজারো অভিযোগ জমা পড়ে, কিন্তু কোনো প্রতিকার মেলে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘শর্ষের মধ্যে ভূত’ থাকলে ভূত তাড়ানো অসম্ভব। বিটিআরসি নামক সরকারি সংস্থাটি বছরের পর বছর শুধু আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু অপারেটরদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক কোনো শাস্তির ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
ফলে অপারেটররা বিটিআরসিকে এক প্রকার বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েই তাদের ‘পকেট কাটা’র মহোৎসব চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
প্যাকেজের ফাঁদ ও ডিজিটাল প্রতারণা মোবাইল কোম্পানিগুলো ইচ্ছেমতো প্যাকেজ তৈরি করে গ্রাহকদের এক ধরনের গোলকধাঁধায় ফেলে দিচ্ছে। চটকদার বিজ্ঞাপনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে নানা শর্ত। গ্রাহকরা এসব অফারের ফাঁদে পা দিয়ে অর্থ খোয়াচ্ছেন। ডিজিটাল বাংলাদেশের যাত্রায় টেলিযোগাযোগ খাত যখন মূল চালিকাশক্তি হওয়ার কথা, তখন এটি পরিণত হয়েছে গ্রাহক ঠকানোর হাতিয়ারে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিটিআরসিকে এখন কেবল নামমাত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে থাকলে চলবে না, বরং গ্রাহকের ‘নির্ভরযোগ্য অভিভাবক’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুধু গণশুনানি করে ক্ষোভ প্রশমন নয়, প্রয়োজন অভিযুক্ত কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। সরকারকে উদ্যোগী হয়ে এই সংস্থাটিকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের এই দুর্ভোগ কমবে না, বরং দিন দিন বাড়তেই থাকবে।






















